Sun 12th Jul 2026, 12:18 am

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ধারাবাহিক প্রাণহানি: ব্যবস্থার কোথায় ত্রুটি?

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ধারাবাহিক প্রাণহানি: ব্যবস্থার কোথায় ত্রুটি?
পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথা আগে থেকেই অনুমিত ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং প্রশাসনও অবগত ছিল যে, টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে জনসাধারণকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে এই চার জেলায় পাহাড়ধসের শিকার হয়ে ১৪ শিশুসহ অন্তত ২৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের প্রায় সবাই পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিসমূহে বসবাস করতেন।

এবারের প্রাণহানির মধ্যে কক্সবাজারেই সর্বাধিক ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জনই রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। এছাড়া, বান্দরবানে পাঁচজন, চট্টগ্রামে চারজন এবং রাঙামাটিতে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে।

প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দাবি করলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম কেবলমাত্র বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পূর্বেই সরিয়ে নেওয়া, তাদের পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতিই প্রাণহানি কমানোর প্রধান উপায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন মন্তব্য করেন যে, প্রশাসন কেবল দুর্ঘটনার সময় সক্রিয় হয়। বৃষ্টি শুরু হলে মাইকিং করে সরে যেতে বলা হলেও, শুধু এই প্রক্রিয়ায় মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব নয় এবং এটি কোনো স্থায়ী সমাধানও হতে পারে না। বরং, বৃষ্টি শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ, পুনর্বাসন এবং পাহাড়কে নিরাপদ করার কাজ সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যক।

এবারের পাহাড়ধসে সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়, যেখানে ১৯ জন নিহতদের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন রোহিঙ্গাশিবিরের বাসিন্দা। গত ৬ বছরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা ৩৯-এ দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১৪ লাখের অধিক নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। গত দেড় বছরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়নের শিকার হয়ে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নতুন আগত অনেক পরিবারই পাহাড় কেটে বা ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি স্থাপন করেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে, গত ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টিতে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলস্বরূপ ৪ হাজার ৩০৭ জন গৃহহীন এবং আরও ২৬ হাজার ১১৯ জন বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরই পাহাড়ের উপর, ঢালে বা পাদদেশে নির্মিত। বর্তমানে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন, যাদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ হাজার জনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এবার যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই নতুন করে আসা রোহিঙ্গা।

আবহাওয়া অধিদপ্তর গত শনিবার থেকেই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, টানা বৃষ্টিতে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের অধিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাতকে বিরল বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকার পরও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে যে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঠিক কত মানুষ বসবাস করছেন, তার কোনো হালনাগাদ জরিপ নেই।

বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। জেলা প্রশাসনের তথ্যানুসারে, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৬৬৬টি, যা বর্তমানে ২৬টি পাহাড়ে বেড়ে ৬ হাজার ৫৫৫-এ দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা, ২০২৩ সালের সর্বশেষ জরিপের পরেও নতুন করে আরও বসতি গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও প্রায় অভিন্ন; জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, নগরের ২৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ বসতি রয়েছে। তবে এই তথ্য তিন বছর আগের, এবং পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর ধারণা, এই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসনের হিসাবে, এ জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে ১ হাজার ৪৬৮টি পরিবার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাসান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিয়মিত প্রচার চালানো হচ্ছে এবং কেউ না সরলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে, তিনি স্বীকার করেন যে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে অন্যত্রে পুনর্বাসন করা।

চট্টগ্রামে পাহাড়ধস কোনো নতুন দুর্যোগ নয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর গঠিত তদন্ত কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশ পেশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে সরিয়ে পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, পাহাড়ের ঢালে নতুন বসতি স্থাপন রোধ, ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়ন এবং পাহাড়ের মালিক সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ।

এর এক দশক পর ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে আরও ১৬৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। দ্বিতীয় দফার তদন্ত কমিটিও প্রায় একই ধরনের ৩৫ দফা সুপারিশ দেয়। অর্থাৎ, ১০ বছরের ব্যবধানে দুই দফা বড় বিপর্যয়ের পরও সমস্যার ধরন বদলায়নি এবং সমাধানের সুপারিশও ছিল প্রায় অভিন্ন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, প্রয়োজনে মানুষকে জোর করেও নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়, তবে অনেকেই পরে আবার নিজ বাড়িতে ফিরে যান। তাঁর ভাষ্য, পাহাড়ের অবৈধ বসতির পেছনে বিভিন্ন মহলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্ছেদ অভিযানও বাধাগ্রস্ত হয়। তাঁরা বছরজুড়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ধসের জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়; বৃষ্টি কেবল শেষ ধাক্কাটি দেয়। বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে ঢালের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করা, বন উজাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসতি গড়ে তোলা এবং পানিনিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পাহাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর টানা বৃষ্টিতে মাটির ভেতরে পানি ঢুকে মাটির কণাগুলোর বন্ধন আলগা করে দেয়, ফলে ঢালের মাটি নিজের ওজন আর ধরে রাখতে পারে না এবং একপর্যায়ে পুরো মাটির স্তর নিচে নেমে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি শুধু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা বা সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হালনাগাদ তালিকা, আগাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, নিরাপদ পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং নতুন করে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা ঠেকাতে সারা বছর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের প্রাণহানির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, পাহাড়ধসকে এখনো মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্ষা শুরু হলে প্রশাসন সতর্কতামূলক তৎপরতা বাড়ালেও, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করা, পুনর্বাসন, পাহাড়ে নতুন বসতি ঠেকানো কিংবা সারা বছর পাহাড় ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদী কাজ আর এগোয় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা Desi Media Point-কে বলেন, সরকারের হাতে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)—সবই আছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তাও ছিল। প্রশ্ন হলো, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আগে থেকেই সরিয়ে নেওয়া গেল না কেন? গওহার নঈম ওয়ারার ভাষ্যমতে, অতীতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষদের জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং প্রশাসন চাইলে সেটি এখনো সম্ভব। এবার তা না হওয়ার পেছনে মাঠ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনিশ্চয়তা ও ভীতি কাজ করেছে বলে তাঁর ধারণা। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করে তাদের সরিয়ে নেওয়া এবং পরে নিরাপদভাবে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালনে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা জোরদারের পরামর্শ দেন।