Wed 22nd Jul 2026, 3:03 am

বিশ্বকাপের উন্মাদনা শেষে: ঘুমের ছন্দ ফেরাতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

বিশ্বকাপের উন্মাদনা শেষে: ঘুমের ছন্দ ফেরাতে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেন শিরোপা জেতার পর, ফুটবলের এই মহোৎসবের পর্দা নেমেছে। এর সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের গত কয়েকদিনের রাত জাগার অভ্যাসে ছন্দপতন ঘটেছে।
বিশ্বকাপের রাতে ম্যাচ দেখার কারণে ঘুমের নিয়মিত চক্র ব্যাহত হওয়া এবং পুনরায় তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।
ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের আবেগ ও উন্মাদনার এক বিশাল নাম। প্রিয় দলকে ঘিরে পতাকা উত্তোলন, জার্সি সংগ্রহ, অফিস বা চায়ের আড্ডায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক—শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসার এই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তরুণ ও যুবকদের পাশাপাশি শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় পর্দায় রাত জেগে খেলা দেখার প্রবণতা বেড়েছিল। বিশ্বকাপ যেন অনেকেরই রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দলের সমর্থকরা একসাথে রাত জেগে বিশ্বকাপকে বরণ করে নিয়েছেন।
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ উল্লেখ করেন যে, বিশ্বকাপ ফুটবল অসংখ্য মানুষের ঘুমের ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর কারণ হলো, বাংলাদেশে স্থানীয় সময় অনুযায়ী বিশ্বকাপের অনেক ম্যাচ গভীর রাত বা ভোরের দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, রাত জেগে খেলা দেখার কারণে গড়ে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কম ঘুম হয়েছে। এই রাত জাগার প্রবণতা স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিগত দেড় মাসে কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিনের বেলায় ক্লান্তি, অবসন্নতা এবং মনোযোগের ঘাটতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতার শিকার হচ্ছেন।
অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্লান্তি নিয়ে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন, যা তাদের দৈনন্দিন কার্যকারিতা ও জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অতিরিক্ত চা বা ক্যাফেইন সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাবসহ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তাছাড়া, প্রিয় দলের জয় বা পরাজয়ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ম্যাচ চলাকালীন স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যার ফলে শারীরিক প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়।
দীর্ঘক্ষণ টিভি বা মোবাইল স্ক্রিনের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
বিশ্বকাপের সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন ব্যাহত হয়েছে। তবে কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করে আবারও স্বাভাবিক জীবন ও ঘুমের ছন্দ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নিচে সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ঘুমের এই সমস্যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দূর হয়ে যায়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু অনিদ্রাজনিত সমস্যা দেখা দিলে, দুপুরের দিকে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা 'ন্যাপ' শরীরকে পুনরায় সতেজ করতে সহায়ক হতে পারে।
২. ঘুমের সময়সূচী স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চা, কফি, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস সাময়িকভাবে পরিহার করা উচিত।
৩. প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, এমনকি ছুটির দিনেও এই নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
৪. ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের ব্যবহার সীমিত করুন। বিছানায় যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে মোবাইল, টেলিভিশন, ল্যাপটপসহ যেকোনো ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। এর পরিবর্তে বই পড়া বা হালকা সুরের গান শোনা যেতে পারে।
৫. নিয়মিত শরীরচর্চা ও হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন, যা উন্নত ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ঘুমের জন্য একটি আরামদায়ক ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য।
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ সতর্ক করেন যে, ঘুমের পরিবর্তিত সময়সূচী যদি দ্রুত ঠিক করা না যায়, তবে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ, মনোযোগের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যদি অনিদ্রার সমস্যা অত্যন্ত তীব্র হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বল্পমাত্রায় ঘুমের ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।