Tue 1st Sep 2026, 11:09 am

বাংলাদেশে ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা: কাঠামোগত দুর্বলতা ও জরুরি নীতিগত সংস্কারের আহ্বান

বাংলাদেশে ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা: কাঠামোগত দুর্বলতা ও জরুরি নীতিগত সংস্কারের আহ্বান
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ নতুন কর্মসংস্থান হারানোর যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই প্রাক্কলিত সংখ্যাটিকে নিছক একটি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করলে সংকটের প্রকৃত গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। বরং এটিকে দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্থনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রায় ৭.৫ কোটি কর্মক্ষম মানুষের বিশাল শ্রমবাজারে বর্তমানে প্রায় ৭.২ কোটি ব্যক্তি বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৪.৫ শতাংশ, যেখানে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ কর্মহীন। এই নাজুক পরিস্থিতিতে যদি আরও ৬ লাখ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হয়, তবে মোট বেকারের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে, যা সামগ্রিক বেকারত্বের হারকে ৫ শতাংশের উপরে উন্নীত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।

অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অবশ্য সর্বদা সরলরৈখিক ধারায় প্রবাহিত হয় না। শ্রমবাজারে একদিকে যেমন প্রতিনিয়ত নতুন কর্মপ্রার্থীরা যুক্ত হন, তেমনি অন্যদিকে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দুর্ভাগ্যবশত অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েন। তবে বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাসকে কোনোক্রমেই লঘু করে দেখার অবকাশ নেই। দেশের বর্তমান সরবরাহজনিত সংকট এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো শ্রমবাজারে একটি নতুন ও তীব্র চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে মন্থর করে দিয়েছে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণ নিয়েও উদ্বেগ বিদ্যমান। যখন এই সম্মিলিত সংকটগুলো আঘাত হানে, তখন অর্থনীতির 'সরবরাহ পক্ষ' এক বড় ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। এর ফলে উৎপাদন হ্রাস পায়, নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত হয় এবং নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের গতি থমকে যায়। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, এর অনিবার্য পরিণতি হলো শ্রমের সামগ্রিক চাহিদা সংকোচন।

জাতীয় অর্থনীতিকে একটি ক্ষুদ্র গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায় না, যার স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মুহূর্তেই গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব। বরং এটি একটি বিশাল জাহাজের ন্যায়, যেখানে একটি ইতিবাচক নীতি গ্রহণের ফলাফল পেতে দীর্ঘমেয়াদী সময় প্রয়োজন হয়। নীতি নির্ধারণ, তার বাস্তবায়ন এবং বাজারে এর প্রভাব প্রতিফলিত হওয়ার মধ্যে বিদ্যমান সময়ের ব্যবধান মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি অত্যাবশ্যক। অতএব, সংকট যখন তীব্র আকার ধারণ করবে, তখন কেবল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেই চলবে না; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পূর্বেই কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

‘কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি’ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসমূহ

বিগত এক দশকেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে একটি দুর্বল সম্পর্ক পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০১৩ সাল থেকে উৎপাদন খাতে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। এই প্রবণতাকে অনেকে ‘কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। সাধারণত প্রযুক্তিগত উন্নতি বা অটোমেশনের কারণে যখন পুরোনো শিল্পে শ্রমের চাহিদা হ্রাস পায়, তখন নতুন খাত তৈরি হয়ে বাড়তি শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা; কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রত্যাশিত রূপান্তর ঘটেনি।

পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর (যেমন চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া) শিল্পায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা শ্রমঘন শিল্প থেকে পর্যায়ক্রমে হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে উন্নীত হয়েছে। এই কাঠামোগত শিল্প রূপান্তর অগণিত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে শিল্পায়ন মূলত তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

যদিও তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, তথাপি চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও ওষুধশিল্পের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে সমমাত্রায় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হয়নি। বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং শুল্ক ফেরতের মতো সুবিধা একটি নির্দিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত থাকার কারণে একটি সুসমন্বিত শিল্প ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। উপরন্তু, দেশীয় বাজারে বিদ্যমান অতিরিক্ত শুল্ক সুরক্ষার কারণে উদ্যোক্তারা রপ্তানির চেয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারকে অধিক লাভজনক মনে করছেন, যা শিল্পের বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দিয়েছে।

এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট, বন্দর ও কাস্টমসে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয় ব্যবসা পরিচালনার খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ অনুপাতের ধারাবাহিক পতন যুক্ত হয়েছে, যা বর্তমান শ্রমবাজার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। ব্যাংক খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট বেসরকারি খাতকে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।

এই কাঠামোগত স্থবিরতার প্রধান শিকার দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক স্নাতক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করলেও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্জিত দক্ষতার একটি বড় ব্যবধান বিদ্যমান। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক প্রথম কর্মসংস্থান পেতে গড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এটি কেবল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অপচয় নয়, বরং সবচেয়ে কর্মক্ষম বয়সের মানবসম্পদের চরম অপব্যবহারও বটে।

একই সময়ে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতটি দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের চাপ নিরসনে সহায়ক হতে পারত। তবে দালাল চক্রের অপতৎপরতা, অত্যধিক অভিবাসন ব্যয় এবং পর্যাপ্ত দক্ষ শ্রমিকের অভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ তার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।

উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের দ্বি-স্তরীয় কৌশলগত রূপরেখা:

১. স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী কার্যপ্রণালী

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষা: দেশের সিংহভাগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তারল্য সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখা অত্যাবশ্যক।

শহরাঞ্চলে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী: গ্রামীণ এলাকায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা নগদ অর্থ প্রদানের কর্মসূচির আদলে শহরাঞ্চলেও দ্রুত একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী চালু করা প্রয়োজন। নগর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ অথবা পরিবেশগত বিভিন্ন প্রকল্পে আকস্মিকভাবে কর্মচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও বাণিজ্য সহজীকরণ: শিল্প-কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং কাস্টমস ও বন্দরগুলোতে বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে অধিক গতিশীল করতে হবে।

২. দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসমূহ

শিল্পের বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাক খাত ব্যতিরেকে অন্যান্য সম্ভাবনাময় শিল্প খাতগুলোকে সমমাত্রায় নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন: শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শ্রমবাজারের আগাম ও নির্ভুল তথ্যের জন্য একটি কার্যকর ‘শ্রমবাজার তথ্য পদ্ধতি’ (Labor Market Information System) গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।

অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুল শ্রমশক্তিকে পর্যায়ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার (যেমন, বেকারত্ব বীমা) আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানি: বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলিত ‘ছয় লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা’ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পূর্বাভাস নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কাঠামোগত দুর্বলতা, দক্ষতাগত ঘাটতি এবং শিল্পনীতিগত সীমাবদ্ধতার এক সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধির পরিমাণগত সূচক বৃদ্ধির চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধি কি সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম হচ্ছে? অর্থনীতি নামক বিশাল জাহাজটিকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কালক্ষেপণ না করে এখনই দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনস্বীকার্য। কারণ, যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দার প্রাথমিক ও প্রধান মাশুল বহন করতে হয় দেশের পরিশ্রমী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপরই।