Mon 31st Aug 2026, 11:21 am

সহকর্মীর বেতন জিজ্ঞাসা: কর্মক্ষেত্রে এক জটিল সামাজিক প্রথা

সহকর্মীর বেতন জিজ্ঞাসা: কর্মক্ষেত্রে এক জটিল সামাজিক প্রথা
তানভীর, একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, বেশ কয়েক বছর ধরে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাঁর কর্মনিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। আকস্মিকভাবে একদিন সহকর্মীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে তিনি জানতে পারেন যে, সম্প্রতি যোগদানকারী একজন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মীর বেতন তাঁর নিজস্ব বেতনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এই তথ্যটি তানভীরকে গভীরভাবে বিচলিত করে। যে প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি এত শ্রম ও সময় বিনিয়োগ করেছেন, সেখানেই কিনা পদমর্যাদায় নিম্নস্থ একজন কর্মীর বেতন তাঁর চেয়ে বেশি! এই বৈষম্য মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এতদিন নিজের বেতন নিয়ে উদাসীন তানভীর এরপর সতীর্থদের মধ্যে তাঁদের বেতন কাঠামো সম্পর্কে অনুসন্ধানে নামেন। যদিও কতিপয় সহকর্মী হাসিমুখে তথ্যটি জানান, অধিকাংশেরই তানভীরের এমন আচরণে বিরক্তি প্রকাশ পায়। অনেকেই এমন ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা করতে অনাগ্রহী।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নারীদের বয়স ও পুরুষদের বেতন জিজ্ঞাসা করা অনুচিত। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই বেতন সম্পর্কিত প্রশ্ন একটি সামাজিক নিষিদ্ধ বিষয় (ট্যাবু) হিসেবে বিবেচিত। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে অন্যান্য বহু বিষয়ে আলোচনা উন্মুক্ত থাকলেও, বেতনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই যেন এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে। অলিখিতভাবে এক ধরনের প্রথা তৈরি হয়েছে যে, বেতন নিয়ে আলোচনা নতুন করে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

আকস্মিকভাবে কাউকে তাঁর বেতন জিজ্ঞাসা করা মৌলিকভাবে দোষণীয় নয়। তবে সামাজিক রীতিনীতির প্রভাবে বেতনের বিষয়টি একটি ট্যাবুতে রূপান্তরিত হয়েছে। একসময় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের বেতন গোপন রাখতে নির্দেশনা দিত। যদিও অনেক কোম্পানিই বর্তমানে এই প্রথা থেকে সরে এসেছে, কর্মীদের মধ্যে সেই ধারণাটি এখনো বিদ্যমান।

আকস্মিক সাক্ষাতে অথবা জনসমক্ষে কাউকে তাঁর বেতন সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকুন। যদি আপনি কারও বেতন সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক হন, তবে প্রথমে তাঁর সঙ্গে একটি সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। এরপর সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি উত্থাপন করুন।

অপরকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করার পরিবর্তে প্রথমে আপনার নিজস্ব বেতনের তথ্যটি জানান। এটি আলোচনার পথ সুগম করবে এবং বেতনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা সহজতর হবে।

কর্মক্ষেত্রে নতুন যোগদানকারী কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বেতন জিজ্ঞাসা করা থেকে বিরত থাকুন। বরং তাঁর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। এটি আপনাদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করবে এবং পরবর্তীকালে বেতন সংক্রান্ত আলোচনা সহজ করে তুলবে।

সকল কর্মীই তাঁদের বেতন সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে আগ্রহী নাও হতে পারেন। যদি কেউ তাঁর বেতন জানাতে অনিচ্ছুক হন, তবে তাঁকে চাপ প্রয়োগ করবেন না। এমনকি পরবর্তীতেও এই বিষয়ে তাঁকে পীড়াপীড়ি বা একই প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকুন। এটিই শিষ্টাচার ও পেশাদারিত্বের পরিচায়ক।

যিনি আপনাকে তাঁর বেতনের তথ্য দিয়েছেন, তিনি আপনার প্রতি আস্থা রেখেই তা করেছেন। অতএব, তাঁর বিশ্বাসের অমর্যাদা করবেন না; বরং তাঁর বেতন সংক্রান্ত বিষয়টি গোপন রাখুন। এর মাধ্যমে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তিও হবে এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কও অটুট থাকবে।

সহকর্মীর বেতন নিয়ে আলোচনা বা প্রশ্ন করা সহজাতভাবে ত্রুটিপূর্ণ নয়; বরং অনেক সময় আপনার ন্যায্য প্রাপ্য সম্পর্কে অবগত হতে অন্যের বেতন কাঠামো সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বেতন জিজ্ঞাসা করার পূর্বে সম্পর্ক, কর্মপরিবেশ এবং বিদ্যমান পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করে নেওয়া অত্যাবশ্যক।