একটি শহরের প্রকৃত বাসযোগ্যতা কেবল আকাশচুম্বী অট্টালিকা, পর্যটন আকর্ষণ কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং দৈনন্দিন জীবনের কিছু মৌলিক দিকই এর প্রধান মাপকাঠি। যেমন, কর্মস্থলে যাতায়াতের সুগমতা, পায়ে হেঁটে বাজার করার সুযোগ, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য রেলস্টেশনের প্রবেশাধিকার কিংবা শিশুর ঠেলাগাড়ি নিয়ে ফুটপাতে নিরাপদ চলাচল—এসবই একটি শহরের জীবনযাত্রার মান নির্ণায়ক।
এই সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলিতেই জাপানের শহরগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, ওসাকা বিশ্বের সপ্তম এবং টোকিও দশম বাসযোগ্য শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে দুটি শহর নিয়ে জাপানই এশিয়ার একমাত্র দেশ, যা এই তালিকায় নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
স্থিতিশীলতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা ও সুসংগঠিত অবকাঠামো—এই সূচকগুলিতে জাপানের শহরগুলি পূর্ণ নম্বর পেলেও, বাসিন্দা ও নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, আরও কিছু সুচিন্তিত ব্যবস্থা দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করে তুলেছে। এই চারটি দিক বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
জাপানের শহরগুলিতে প্রতিটি পাড়াতেই দৈনন্দিন জীবনের সবরকম প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ বিদ্যমান। 'শোতেনগাই' এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এগুলি মূলত সরু সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক এলাকা, যেখানে ছোট ছোট দোকানপাটে ভরে থাকে। সাধারণত এই সড়কগুলিতে ডেলিভারি ভ্যান ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল সীমিত থাকে এবং স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবারের দোকানের প্রাচুর্য দেখা যায়। শোতেনগাই কেবল কেনাকাটার স্থান নয়, এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করে। অনেক প্রাচীন শোতেনগাই বড় মন্দির বা উপাসনালয়ের পথে গড়ে উঠেছে, আর আধুনিকগুলি রেলস্টেশন বা জনসমাগম কেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। জাপানের শহর ও শহরতলি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই শপিং স্ট্রিটগুলি দেশটির স্থানীয় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচায়ক।
পাওয়ার হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী জশ গ্রিসডেল, যিনি গত ১৮ বছর ধরে টোকিওতে বসবাস করছেন, উল্লেখ করেন যে ছাদঢাকা ব্লকের মধ্যেই সবজির দোকান, ঐতিহ্যবাহী কফিশপ, ক্লিনিক, ১০০ ইয়েনের দোকান এবং রাতের খাবারের বিভিন্ন ব্যবস্থা সহ সবকিছুই পাওয়া যায়।
জাপানের গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে তার সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য সুপরিচিত। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী গ্রিসডেলের মতো ব্যক্তিদের জন্য এই বৈশিষ্ট্যগুলি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের প্রায় যেকোনো স্টেশনে পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যাওয়া সম্ভব এবং লিফট নষ্ট থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থার সুবন্দোবস্ত থাকে।
২০০৬ সালের 'ব্যারিয়ার-ফ্রি' আইন এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই আইনের পর গত দুই দশক ধরে দেশজুড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করে তোলা হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলির দশটির মধ্যে নয়টিরও বেশি এমনভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যাতে সিঁড়ি ব্যবহার না করেও নির্বিঘ্নে চলাচল করা যায়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হলুদ উঁচু রেখাযুক্ত পথের উদ্ভাবনও জাপানেই ঘটেছিল। ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী সেইইচি মিয়াকে দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকা এক বন্ধুকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করেন।
আধুনিকতার অর্থ যে সব পুরনোকে পরিত্যাগ করা নয়, জাপানের শহরগুলি তারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ওসাকার কাছে কায়াশিমা স্টেশনের ছাদ ভেদ করে বেড়ে ওঠা প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো কর্পূরগাছটি এর একটি সার্থক দৃষ্টান্ত।
শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলিতেও পুরোনো মন্দির, ছোট রেস্তোরাঁ, গাছপালা এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার উপস্থিতি সযত্নে ধরে রাখা হয়েছে। এর ফলে আধুনিকতার মাঝেও মানুষ তার নিজস্ব স্থানের সঙ্গে এক গভীর আত্মিক সংযোগ অনুভব করতে পারে।
কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হওয়া, ট্রেনে নীরবতা বজায় রাখা, অগ্রাধিকার আসন ছেড়ে দেওয়া, যেখানে-সেখানে আবর্জনা না ফেলা কিংবা বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য পৃথক করা—এই সকল অভ্যাস শহরের জীবনযাত্রাকে শান্ত ও সুবিন্যস্ত রাখে।
জাপানের বাসযোগ্য শহরের গল্প তাই কেবল উন্নত রেলব্যবস্থা, লিফট বা সুন্দর রাস্তার গল্প নয়। বরং এটি এমন একটি শহর গড়ে তোলার গল্প, যেখানে দৈনন্দিন জীবন সহজ, চলাচল সবার জন্য উন্মুক্ত, পুরাতন ও নতুনের সহাবস্থান বিদ্যমান এবং নাগরিকেরাও গণপরিসরের প্রতি দায়িত্বশীল। শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার এই চারটি সহজ নিয়মই হয়তো ওসাকা ও টোকিওকে বিশ্বের সেরা শহরগুলির কাতারে নিয়ে গেছে।
এই সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলিতেই জাপানের শহরগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, ওসাকা বিশ্বের সপ্তম এবং টোকিও দশম বাসযোগ্য শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে দুটি শহর নিয়ে জাপানই এশিয়ার একমাত্র দেশ, যা এই তালিকায় নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
স্থিতিশীলতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা ও সুসংগঠিত অবকাঠামো—এই সূচকগুলিতে জাপানের শহরগুলি পূর্ণ নম্বর পেলেও, বাসিন্দা ও নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, আরও কিছু সুচিন্তিত ব্যবস্থা দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করে তুলেছে। এই চারটি দিক বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
জাপানের শহরগুলিতে প্রতিটি পাড়াতেই দৈনন্দিন জীবনের সবরকম প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ বিদ্যমান। 'শোতেনগাই' এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এগুলি মূলত সরু সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক এলাকা, যেখানে ছোট ছোট দোকানপাটে ভরে থাকে। সাধারণত এই সড়কগুলিতে ডেলিভারি ভ্যান ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল সীমিত থাকে এবং স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবারের দোকানের প্রাচুর্য দেখা যায়। শোতেনগাই কেবল কেনাকাটার স্থান নয়, এটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করে। অনেক প্রাচীন শোতেনগাই বড় মন্দির বা উপাসনালয়ের পথে গড়ে উঠেছে, আর আধুনিকগুলি রেলস্টেশন বা জনসমাগম কেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। জাপানের শহর ও শহরতলি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই শপিং স্ট্রিটগুলি দেশটির স্থানীয় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচায়ক।
পাওয়ার হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী জশ গ্রিসডেল, যিনি গত ১৮ বছর ধরে টোকিওতে বসবাস করছেন, উল্লেখ করেন যে ছাদঢাকা ব্লকের মধ্যেই সবজির দোকান, ঐতিহ্যবাহী কফিশপ, ক্লিনিক, ১০০ ইয়েনের দোকান এবং রাতের খাবারের বিভিন্ন ব্যবস্থা সহ সবকিছুই পাওয়া যায়।
জাপানের গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে তার সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য সুপরিচিত। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী গ্রিসডেলের মতো ব্যক্তিদের জন্য এই বৈশিষ্ট্যগুলি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের প্রায় যেকোনো স্টেশনে পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যাওয়া সম্ভব এবং লিফট নষ্ট থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থার সুবন্দোবস্ত থাকে।
২০০৬ সালের 'ব্যারিয়ার-ফ্রি' আইন এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই আইনের পর গত দুই দশক ধরে দেশজুড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করে তোলা হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলির দশটির মধ্যে নয়টিরও বেশি এমনভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যাতে সিঁড়ি ব্যবহার না করেও নির্বিঘ্নে চলাচল করা যায়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হলুদ উঁচু রেখাযুক্ত পথের উদ্ভাবনও জাপানেই ঘটেছিল। ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী সেইইচি মিয়াকে দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকা এক বন্ধুকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করেন।
আধুনিকতার অর্থ যে সব পুরনোকে পরিত্যাগ করা নয়, জাপানের শহরগুলি তারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ওসাকার কাছে কায়াশিমা স্টেশনের ছাদ ভেদ করে বেড়ে ওঠা প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো কর্পূরগাছটি এর একটি সার্থক দৃষ্টান্ত।
শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলিতেও পুরোনো মন্দির, ছোট রেস্তোরাঁ, গাছপালা এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার উপস্থিতি সযত্নে ধরে রাখা হয়েছে। এর ফলে আধুনিকতার মাঝেও মানুষ তার নিজস্ব স্থানের সঙ্গে এক গভীর আত্মিক সংযোগ অনুভব করতে পারে।
কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হওয়া, ট্রেনে নীরবতা বজায় রাখা, অগ্রাধিকার আসন ছেড়ে দেওয়া, যেখানে-সেখানে আবর্জনা না ফেলা কিংবা বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য পৃথক করা—এই সকল অভ্যাস শহরের জীবনযাত্রাকে শান্ত ও সুবিন্যস্ত রাখে।
জাপানের বাসযোগ্য শহরের গল্প তাই কেবল উন্নত রেলব্যবস্থা, লিফট বা সুন্দর রাস্তার গল্প নয়। বরং এটি এমন একটি শহর গড়ে তোলার গল্প, যেখানে দৈনন্দিন জীবন সহজ, চলাচল সবার জন্য উন্মুক্ত, পুরাতন ও নতুনের সহাবস্থান বিদ্যমান এবং নাগরিকেরাও গণপরিসরের প্রতি দায়িত্বশীল। শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার এই চারটি সহজ নিয়মই হয়তো ওসাকা ও টোকিওকে বিশ্বের সেরা শহরগুলির কাতারে নিয়ে গেছে।