Sat 15th Aug 2026, 2:13 pm

পরনিন্দা (গিবত): কারণ, স্বরূপ ও ইসলামে এর বিধান

পরনিন্দা (গিবত): কারণ, স্বরূপ ও ইসলামে এর বিধান
সামাজিক জীবনে যেসব পাপ অত্যন্ত সহজে ও নীরবে প্রবেশাধিকার লাভ করে, ‘গিবত’ বা পরনিন্দা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। বন্ধুত্বের আড্ডা, চায়ের আসর অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় প্রায়শই আমরা হাস্যরসের ছলে অন্যের অনুপস্থিতিতে তার ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করে থাকি।
এই ধরনের আলোচনা সমাজে এমনভাবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে যে একে পাপ হিসেবে গণ্য করার মননশীলতা আমরা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।
আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বিনোদন প্রতীয়মান হলেও, ইসলামি জীবনদর্শনে এটিকে একটি ঘৃণ্য অপরাধ ও আত্মিক অসুস্থতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে গিবত বা পরনিন্দাকে আপন মৃত ভাইয়ের কাঁচা মাংস ভক্ষণের ন্যায় এক বীভৎস কর্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, "হে সেই সকল ব্যক্তি, যারা কেবল মুখে ঈমান এনেছো কিন্তু অন্তর পর্যন্ত বিশ্বাস পৌঁছায়নি! তোমরা মুসলমানদের গিবত করো না এবং তাদের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করো না; কেননা যে তার ভাইয়ের ত্রুটি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার ত্রুটি উদ্ঘাটন করেন, আর আল্লাহ যার ত্রুটি উদ্ঘাটন করেন, তাকে তার গৃহের অভ্যন্তরেও অপদস্থ করে ছাড়েন।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৮০)
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে কুদামা আল-মাকদিসির গবেষণালব্ধ তত্ত্বের আলোকে গিবতের প্রকৃত স্বরূপ, এর নেপথ্য কারণসমূহ, ইসলামে এর ব্যতিক্রমী বিধানাবলি এবং এই সামাজিক ব্যাধি থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত উপায়সমূহ এখানে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

গিবত আসলে কী

বহু মানুষ ধারণা করেন যে, সত্য কথা বললে তা গibত হিসেবে পরিগণিত হয় না। তবে সাহাবায়ে কেরাম যখন নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, "গিবত কী?" তিনি উত্তরে বললেন, "তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কোনো কথা উল্লেখ করা, যা সে অপছন্দ করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
অতঃপর সাহাবিরা পুনরায় প্রশ্ন করলেন, "আমি যা বলছি তা যদি প্রকৃতপক্ষে আমার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে?" মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বললেন, "তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবেই তুমি তার গিবত করলে; আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তো তুমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
ইবনে কুদামা স্পষ্ট করেছেন যে, গিবত কেবল মৌখিক মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারো অনুপস্থিতিতে তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য (যেমন: খোঁড়া, খাটো অথবা ট্যারা হিসেবে উল্লেখ করা), পারিবারিক পরিচয়, নৈতিক মানদণ্ড বা পোশাকের ত্রুটি নিয়ে কটূক্তি করা যেমন গিবতের শামিল; ঠিক তেমনি ইশারা-ইঙ্গিত, প্রতীকী অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করা কিংবা লিখিতভাবে কারো চরিত্রহনন করাও গিবতেরই অংশ।
এমনকি যখন কেউ অন্য কারো গিবত করে, তখন পাশে বসে তা উপভোগ করা অথবা নীরব সমর্থন জানানোও গিবতে অংশীদার হওয়ার নামান্তর। তাফসির বিশারদগণ বলেছেন যে, গিবত শ্রবণের সময় মৌখিক প্রতিবাদ অপরিহার্য; আর তা সম্ভবপর না হলে অন্তত অন্তরে ঘৃণা পোষণ করে সেই স্থান ত্যাগ করা আবশ্যক।

মানুষ কেন গিবত করে?

গিবতের মূলে কয়েকটি মৌলিক প্রবৃত্তিগত দুর্বলতা ও চারিত্রিক ত্রুটি কাজ করে। এই কারণসমূহ চিহ্নিত করতে পারলে তা থেকে নিজেদের রক্ষা করা সহজতর হয়:

১. রাগ ও ক্ষোভ প্রশমন: কারো প্রতি ক্রোধ বা প্রতিশোধের স্পৃহা জাগ্রত হলে মানুষ তার পেছনে অপপ্রচার চালিয়ে মানসিক সান্ত্বনা লাভ করতে চায়।

২. সহচরদের সহজ সমর্থন অর্জন: আড্ডার আসরে বন্ধুদের সাথে তাল মেলাতে কিংবা সবাইকে হাসানোর উদ্দেশ্যে অনেকে অন্যের চরিত্র নিয়ে কৌতুক করে থাকে।

৩. আত্ম-শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ: অমুক ব্যক্তি নির্বোধ, সংকীর্ণমনা বা অজ্ঞ—এমন কথা প্রচার করে পরোক্ষভাবে নিজেকে জ্ঞানী ও উচ্চতর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এক অসুস্থ প্রবণতা।

৪. অহংকার ও ঈর্ষা: অন্যের সাফল্য বা সম্মান দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার ত্রুটি-বিচ্যুতি জনসম্মুখে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

গিবতের আত্মিক চিকিৎসা

গিবতের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করার এক কার্যকর উপায় হলো পরকালে এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে অবগত থাকা। কেয়ামতের দিন যখন কোনো বান্দা তার ইবাদতসমূহ নিয়ে উপস্থিত হবে, তখন গিবতের কাফফারা স্বরূপ তার নেক আমলগুলো সেই অত্যাচারিত ব্যক্তিকে অর্পণ করা হবে।
আর যদি তার নেক আমলসমূহ নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে সেই ব্যক্তির পাপের বোঝা গিবতকারীর স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। মহানবী (সা.) এই ব্যক্তিকে পরকালের প্রকৃত ‘নিঃস্ব’ বা ‘দেউলিয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যে পৃথিবীতে সালাত ও সাওম পালন করা সত্ত্বেও অন্যের সম্মানহানি করার অপরাধে পরকালে তার সমস্ত সওয়াব হারাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)
এতদ্ব্যতীত, যখনই কারো গিবত করার অভিলাষ জাগ্রত হবে, তখনই নিজের অভ্যন্তরীণ অসংখ্য ত্রুটিবিচ্যুতি সম্পর্কে চিন্তা করা সমীচীন। যে ব্যক্তি নিজের ভুল সংশোধনে ব্যাপৃত থাকে, অন্যের পেছনে সময় ব্যয় করার সুযোগ তার অবশিষ্ট থাকে না।
আর যদি কেউ মনে করে যে তার কোনো দোষ নেই, তবে তার কর্তব্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করা—যাতে তিনি তাকে পবিত্র রেখেছেন, এবং গিবতের ন্যায় নিকৃষ্টতম পাপে নিজের হাত-মুখ কলুষিত না করা।

কখন গিবত করা অন্যায় নয়

ইসলামে কিছু সুনির্দিষ্ট জনকল্যাণমূলক ও আইনি পরিস্থিতিতে কারো প্রকৃত দোষ বা অন্যায়ের বিবরণ প্রকাশ করা গিবত হিসেবে বিবেচিত হয় না, বরং তা অনুমোদিত। এই ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ—

১. জুলুমের প্রতিকার প্রার্থনা: কোনো অত্যাচারিত বা মজলুম ব্যক্তির বিচারক অথবা কর্তৃপক্ষের কাছে অত্যাচারীর কৃত অন্যায়ের বিবরণ পেশ করা।

২. অন্যায় প্রতিরোধে সহায়তা চাওয়া: সমাজে বিস্তৃত কোনো অপরাধ বা অপরাধীকে নিবৃত্ত করতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে প্রকৃত ঘটনা উপস্থাপন করা।

৩. ফতোয়া ও আইনি উপদেশ গ্রহণ: মুফতি বা বিচারকের কাছে অধিকার আদায়ের প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ প্রদান করা।

৪. মুসলিমদের ক্ষতি থেকে সাবধান করা: বিবাহ, ব্যবসায়িক চুক্তি, আমানত স্থাপন কিংবা কোনো পাপিষ্ঠ বা প্রতারক ব্যক্তির সাহচর্য থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে সত্য তথ্য প্রকাশ করা।

৫. সুনির্দিষ্ট পরিচিতি প্রদানে নাম উল্লেখ: যদি কারো এমন কোনো নাম বা উপাধি থাকে যা ছাড়া তাকে শনাক্ত করা সম্ভব নয় (যেমন: ‘খোঁড়া’ বা ‘অন্ধ’ নামে সুপরিচিত কোনো ব্যক্তি), তবে হেয় করার উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে কেবল পরিচয় স্পষ্ট করার জন্য তা উচ্চারণ করা।

৬. প্রকাশ্যে পাপাচারী ব্যক্তি: যে ব্যক্তি জনসম্মুখে নির্লজ্জভাবে মদ্যপান, জুলুম বা বেহায়াপনা করে এবং তজ্জন্য লজ্জা অনুভব করে না, তার সেই অন্যায়ের আলোচনা করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না।

তওবা ও গিবতের কাফফারা

গিবত একটি দ্বিমুখী অপরাধ। এর মাধ্যমে একইসাথে মহান আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা হয় এবং বান্দার অধিকারের (মানব অধিকার) ওপর আঘাত হানা হয়। অতএব, কেবল আল্লাহর কাছে 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠ করলেই গিবতের গুনাহ মাফ হয় না।
যে ব্যক্তির গিবত করা হয়েছে, যদি সে বিষয়টি অবগত হয়ে থাকে, তবে তার নিকট স্বয়ং উপস্থিত হয়ে সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করে নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)
আর যদি সেই ব্যক্তি বিষয়টি একেবারেই অজ্ঞাত থাকে, তবে তাকে জানিয়ে নতুন করে সম্পর্ক নষ্ট বা আঘাত না করে, তার জন্য অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, গোপনে তার প্রশংসা করতে হবে এবং তার কল্যাণ কামনায় দোয়া করতে হবে। (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন, দারুল মানারাহ, আল-মানসুরা, ২০০২, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৯১)