Mon 10th Aug 2026, 12:20 pm

২৫ পেরোলে কর্মসংস্থান: তরুণদের জন্য কি বাড়ছে চাকরির বাজারের চ্যালেঞ্জ?

২৫ পেরোলে কর্মসংস্থান: তরুণদের জন্য কি বাড়ছে চাকরির বাজারের চ্যালেঞ্জ?
একটি সাক্ষাত্কার বোর্ডের সাধারণ প্রশ্ন: ‘আপনার বয়স কত?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে একজন তরুণ প্রার্থীর সহাস্য কিন্তু মর্মস্পর্শী জবাব ছিল, ‘স্যার, দাপ্তরিক নথিতে ২৭ বছর, তবে কর্মসংস্থানের দীর্ঘ অন্বেষণে ক্লান্তিতে আমার আত্মাকে ৩৭ বছরের মনে হয়!’ আপাতদৃষ্টিতে কৌতুক মনে হলেও, সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য এটি এক সুপরিচিত ও কঠোর বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে নিরলস প্রস্তুতি, একের পর এক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং ফলাফলের দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে তাদের বয়স নীরবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

মিরপুরের বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম), যার বর্তমান বয়স ২৮ বছর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার পর গত সাড়ে তিন বছর ধরে তিনি নিবিষ্ট মনে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিসিএস-এর পাশাপাশি তিনি ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করছেন। একটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় পরবর্তী পরীক্ষার জন্য নিবিড় প্রস্তুতি। ফয়সালের ন্যায় অসংখ্য তরুণের কর্মজীবনের সূচনাপর্ব বর্তমানে কেবল পরীক্ষা প্রস্তুতির ঘেরাটোপেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলস্বরূপ কেবল তাদের বয়সই বাড়ছে না, বরং তাদের কর্মজীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও উর্বর সময়টিও অপচয় হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বর্তমানে পূর্বের তুলনায় দ্রুততার সাথে বিসিএস-এর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করছে। তবে, এই ত্বরান্বিত প্রক্রিয়ার সুফল চাকরিপ্রার্থীরা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না। কারণ, বিসিএস-এর চূড়ান্ত সুপারিশের পর পুলিশ ভেরিফিকেশনে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায়, পিএসসি দ্রুত ফল প্রকাশ করলেও প্রার্থীদের চূড়ান্তভাবে চাকরিতে যোগদানের জন্য পূর্বের মতোই দীর্ঘ অপেক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, যে তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ২৩-২৫ বছর বয়সে প্রস্তুতি শুরু করেন, তাদের বয়স চূড়ান্ত যোগদানের পূর্বেই ২৭ বা ২৮ পেরিয়ে যায়। আর একাধিকবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হলে তাদের বয়স ত্রিশের কোঠায় পৌঁছে যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট: তরুণ প্রজন্মের কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই কাঠিন্য কেবল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও এর স্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) কর্তৃক প্রকাশিত ‘এমপ্লয়মেন্ট আউটলুক ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ২৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অর্থ হলো, শিক্ষাজীবন সমাপনান্তে কর্মজীবনে পদার্পণের এই সময়টিই তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

এছাড়াও, আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর ২০২৬ সালের একাধিক প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তির অগ্রগতির প্রভাবে প্রাথমিক স্তরের কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ফলস্বরূপ, নতুন কর্মীদের কাছ থেকে শুরুতেই অধিকতর কাজের দক্ষতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রেন্ডস ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে তরুণ বেকারত্বের হার এখনও ১২.৪ শতাংশ। প্রায় ২৬ কোটি তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে অবস্থান করছে। আইএলও সতর্ক করে বলেছে যে, কর্মজীবনের সূচনালগ্নে দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকা ভবিষ্যৎ কর্মজীবন এবং উপার্জনের উপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আমাদের তরুণদের পিছিয়ে থাকার কারণ: বাংলাদেশে সরকারি চাকরি এখনও তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। ফলস্বরূপ, বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি চাকরির জন্য কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়া অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয় না। তবে, মূল ঝুঁকিটি অন্যক্ষেত্রে নিহিত। যখন একজন তরুণ কয়েক বছর ধরে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য অপেক্ষা করেন, তখন একই সময়ে তার সমবয়সী অন্য কেউ বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তারা নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করেন এবং পেশাগত যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এর ফলে, যদি শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে সাফল্য না আসে, তবে দীর্ঘ প্রস্তুতি গ্রহণকারী তরুণকে বেসরকারি চাকরির বাজারে সম্পূর্ণ নতুন করে শুরু করতে হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল একটি সনদ বা ডিগ্রি দিয়ে চাকরি লাভের সুযোগ সীমিত। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক দক্ষতার উপর ভিত্তি করে কর্মী নিয়োগ করছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ নিঃসন্দেহে ফলপ্রসূ হতে পারে, তবে সামগ্রিক কর্মজীবনকে কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভরশীল করে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপ্তির পর থেকেই কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করা অপরিহার্য। ইন্টার্নশিপ, খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, শিক্ষানবিশ পদ বা ছোট প্রকল্পগুলির মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা করা যেতে পারে। এতে সাময়িক আয় তুলনামূলক কম হলেও মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় এবং জীবনবৃত্তান্তে তা যোগ করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি, বর্তমান যুগের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন আবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বয়সের একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং সরকারি চাকরির প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিকল্প কর্মজীবনের পথ বেছে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা।

ফয়সালের ন্যায় তরুণদের জন্য প্রশ্নটি কেবল ‘কবে চাকরি হবে’ তা নয়, বরং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—চাকরি লাভের পূর্ববর্তী সময়টিকে কীভাবে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানো যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা কিংবা পরীক্ষায় সাময়িক ব্যর্থতা কখনো কর্মজীবনকে স্থবির করে দিতে পারে না। তবে, কোনো কাজ বা দক্ষতা অর্জন না করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে, সেই অপেক্ষাই একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।