Tue 28th Jul 2026, 3:21 am

আন্ডারওয়ার্ল্ডের জটাজালে জড়িয়ে, কারাভোগের পর হারিয়ে গেলেন যে তারকা

আন্ডারওয়ার্ল্ডের জটাজালে জড়িয়ে, কারাভোগের পর হারিয়ে গেলেন যে তারকা
এককালে বলিউডের প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেত্রীদের অন্যতম ছিলেন মনিকা বেদি। হিন্দি, তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি ও বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে অবদান রেখে তিনি ধীরে ধীরে নিজের স্থান সুদৃঢ় করছিলেন। তবে, তাঁর অভিনয় প্রতিভার চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনই একসময় অধিকতর আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ভারতের কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আবু সালেমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জেরে মনিকা বেদির কর্মজীবন প্রায় ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। কারাভোগ, আদালতের টানাপোড়েন, জাল পাসপোর্ট মামলা এবং তীব্র সামাজিক বিতর্ক তাঁকে এমন এক প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেয়, যেখান থেকে মূলধারার বলিউডে তাঁর প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হয়নি। আজও মনিকা বেদির নাম উচ্চারিত হলে তাঁর অভিনয় নৈপুণ্যের চেয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সেই বিতর্কিত অধ্যায়টিই বেশি আলোচিত হয়।

পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার এক শিখ পরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মনিকা বেদি। পিতার কর্মস্থল পরিবর্তনের সুবাদে তাঁর পরিবার একসময় নরওয়েতে স্থানান্তরিত হয়। উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির পর অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রূপালি জগতে তাঁর অভিষেক ঘটে। প্রারম্ভিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না এলেও, দক্ষিণ ভারতীয় এবং পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীতে হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর কাজের সুযোগ আসে। ‘সুরক্ষা’, ‘জোড়ি নম্বর ওয়ান’, ‘পেয়ার ইশক অউর মোহাব্বত’—এর মতো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেই সময় অনেকেই অনুমান করেছিলেন যে, বলিউডে তাঁর এক উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মজীবন অপেক্ষা করছে।

মনিকা বেদির জীবনের গতিপথ আমূল পরিবর্তন হয় নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আবু সালেমের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এই পরিচয় অতি দ্রুত গভীর সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়।

সেই সময়ে আবু সালেম কেবল ভারতের একজন শীর্ষ পলাতক অপরাধীই ছিলেন না, বলিউডে অর্থলগ্নি, চাঁদাবাজি এবং তারকাদের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগেও তিনি কুখ্যাত ছিলেন। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবেও তাঁর নাম উঠে এসেছিল।

পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মনিকা বেদি দাবি করেন যে, প্রাথমিকভাবে তিনি আবু সালেমের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, সালেম নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। অবশ্য, এই দাবি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক বিদ্যমান।

আবু সালেমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সংবাদ জনসমক্ষে আসার পর থেকেই মনিকা বেদিকে ঘিরে বলিউডে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করে। প্রযোজক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একাংশ তাঁর সঙ্গে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতে থাকেন।

তৎকালীন বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাপক প্রভাব নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল। নির্মাতাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, অভিনেতাদের প্রতি হুমকি এবং চলচ্চিত্রে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগ—এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হতো। এমন এক নাজুক সময়ে একজন অভিনেত্রীর নাম সরাসরি একজন কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়। ফলস্বরূপ, তাঁর কাজের সুযোগ ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে এবং নতুন চলচ্চিত্রের প্রস্তাব প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

২০০২ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে স্থানীয় পুলিশ আবু সালেম ও মনিকা বেদিকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ওঠে যে, তাঁরা জাল পরিচয়পত্র ও ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে সেখানে অবস্থান করছিলেন। এই গ্রেপ্তারের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পর্তুগালে কয়েক বছর ধরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর তাঁদের ভারতে প্রত্যর্পণ করা হয়। ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর মনিকা বেদির বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে অবৈধ ভ্রমণ।

মনিকা বেদি এক দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হন। অবশেষে, জাল পাসপোর্ট–সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধমূলক কার্যকলাপে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পরবর্তীতে তিনি তাঁর সাজা ভোগ করেন এবং মুক্তি লাভ করেন। আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটলেও জনমানসে তাঁর পরিচিতি পরিবর্তিত হয়। তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রইলেন না, বরং এক বিতর্কিত চরিত্রে রূপান্তরিত হন।

কারা মুক্তির পর মনিকা বেদি পুনরায় অভিনয় জগতে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করেন। তিনি টেলিভিশনের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’-এ অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি টেলিভিশন ধারাবাহিকেও অভিনয় করেন। কিছু আঞ্চলিক চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখা যায়। কিন্তু বলিউডে যে সম্মানজনক অবস্থান তিনি একসময় অর্জন করছিলেন, তা আর পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। এর কারণ কেবল আইনি জটিলতাই ছিল না, বরং তাঁর সঙ্গে জড়িত বিতর্কই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় অন্তরায়। প্রযোজকরা তাঁকে নিয়ে কাজ করার ঝুঁকি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এমনকি দর্শকের কাছেও তিনি অভিনয় শিল্পীর চেয়ে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবেই অধিক পরিচিতি লাভ করেন।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মনিকা বেদি উল্লেখ করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট সম্পর্কের কারণে তাঁকে জীবনের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। মনিকা দাবি করেন যে, তিনি কেবল ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু সেই সম্পর্কই তাঁর কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক প্রশান্তি সম্পূর্ণ কেড়ে নেয়। মনিকার নিজস্ব ভাষায়, তিনি দীর্ঘ বছর ধরে নিজের হারানো পরিচিতি পুনরুদ্ধারের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু অতীতের সেই সুদীর্ঘ ছায়া তাঁকে কখনোই পুরোপুরি মুক্তি দেয়নি।

(তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)