কক্সবাজার জেলাজুড়ে নয় দিনের ভয়াবহ বন্যায় সাত লাখ মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক অবকাঠামো, কৃষি, মৎস্য, এবং বেড়িবাঁধসহ মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে অন্তত ৮৯০ কোটি টাকার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রণীত প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিন কক্সবাজারে ছিল মুষলধারে বৃষ্টিপাত, যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত। এর ফলে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় এবং বেশ কয়েকটি স্থানে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটে। ১২ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, বহু মানুষ এখনো পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথন থেকে জানা গেছে, বন্যার পানি অপসরণের সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসমূহের কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। দুর্গত অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ নিরাপদ পানীয় জল এবং খাদ্যের তীব্র সংকটে ভুগছে। তবে, প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুসারে, বন্যার প্রকোপে জেলার দশটি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টিই কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। পাঁচটি পৌরসভা এলাকার মধ্যে চারটি পৌরসভার বাসিন্দারাও এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই দুর্যোগে জেলার অন্তত সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, বন্যা ও ভূমিধসের সম্মিলিত প্রভাবে জেলায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য।
পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা রাশেদা বেগম তার দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করে বলেন, "গত বুধবার রাতে আমার ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। চার সন্তান নিয়ে এই জলমগ্ন পরিবেশেই বসবাস করতে হচ্ছে। ঘরে রান্নার কোনো সুযোগ নেই; গত পাঁচ দিন ধরে শুধুমাত্র শুকনো খাবার খেয়ে আমরা বেঁচে আছি।"
জেলা ৪৭টি জেলায় এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ৭,৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে আরও ৩,৬৩৫ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২৩৩ মেট্রিক টন চাল বিতরণের কাজ চলমান। তবে, জেলার জন্য আরও ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, নগদ ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, ৪,৮৮৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৯৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের জরুরি চাহিদা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, জুলাই মাসে কক্সবাজারে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেখানে ৯২৪ মিলিমিটার, সেখানে ৪ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে মাত্র নয় দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণেই জেলায় এবার এক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি দ্রুত অপসারিত হয়েছে। তিনি আরও জানান, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।
উন্মোচিত হচ্ছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন
পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া অরুণিমা আশ্রয়ণকেন্দ্রে প্রায় ৪০টি ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। গত মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, আশ্রয়ণকেন্দ্রে পৌঁছানোর রাস্তাটি এখনো জলমগ্ন। কোমরসমান জল ভেঙে মানুষ চলাচল করছে। এমনকি আশ্রয়ণকেন্দ্রের উঠানেও হাঁটুসমান পানি জমে আছে। বন্যায় অন্তত ১৫টি বসতঘরের মেঝে দেবে গেছে এবং সাতটি বসতঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে।
দুপুরের দিকে আশ্রয়ণকেন্দ্রের একটি ঘরে জমে থাকা পানি সরাচ্ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী রাশেদা বেগম। তার ঘরের ভেতরে তখনো হাঁটুপানি বিদ্যমান ছিল। তিনি জানান, "গত বুধবার রাতে আমার বাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এই জলমগ্ন অবস্থায় আমি আমার চার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছি। রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং গত পাঁচ দিন ধরে আমরা শুধু শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।"
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, "গত সোম ও মঙ্গলবার সারাদিন কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। এর ফলে জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে পানি দ্রুত সাগরের দিকে নেমে যাচ্ছে। তবে, নিচু এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি গ্রামে এখনো প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।"
পেকুয়ার পার্শ্ববর্তী উপজেলা চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা কুতুববাজার থেকে গোবিন্দপুরগামী সড়কটি গত সোমবার দুপুরেও কোমরসমান পানিতে নিমজ্জিত ছিল। যদিও গতকাল দুপুরে সেখানে আর পানি দেখা যায়নি, তবে পানি নেমে যাওয়ার ফলে সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে এই গর্তগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
একইভাবে, চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, হারবাং, কৈয়ারবিল, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, চিরিঙ্গা, বরইতলী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার আওতাধীন শতাধিক সড়কের প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক কিলোমিটার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় স্লুইসগেটের কারণে বন্যার পানি নেমে যেতে বিলম্ব হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, উপজেলার অন্তত ১১টি স্লুইসগেট স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাছ ধরার জাল স্থাপন করে আটকে রেখেছিলেন। মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, "আমরা যখন স্লুইসগেটগুলো খুলে দিয়ে আসি, তখন কিছু কুচক্রী মহল সেগুলো পুনরায় বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে, প্রতিটি স্লুইসগেটে পাহারা বসিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে এবং এখন দ্রুতগতিতে পানি অপসারিত হচ্ছে।"
৮৯০ কোটি টাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বন্যায় জেলায় বসতবাড়ি, মৎস্যসম্পদ, কৃষি, সড়ক অবকাঠামো, সেতু-কালভার্ট, এবং বেড়িবাঁধের ভাঙনসহ মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ৮৯০ কোটি টাকার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে যে, ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন এবং ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল। উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে, পেকুয়া উপজেলায় সর্বাধিক ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া, মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এবং রামুর ৩৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় মোট ১,৬১৩টি বসতবাড়ি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন যে, জেলার ৬১টি ইউনিয়নের অন্তর্গত ২,৪৪০ হেক্টর আয়তনের ৩,৯১৮টি পুকুর এবং ৪৫৩টি চিংড়ি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৭৬৮ জন মৎস্যচাষীর প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, বন্যার পানিতে জেলার ১০,৪০১ একর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, যা অন্তত ৪৩,২১০ জন কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৬,৪৭২ একর আউশ ধান, ৯১৪ একর বীজতলা, ২,৩৫৯ একর শাকসবজি এবং এক শতাধিক একর পানের বরজ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে এবং তাদের কাছে দ্রুত বীজ, সার ও প্রণোদনা সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং পাহাড়ি ঢলের সম্মিলিত প্রভাবে ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ৪৪টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্ব পাড়ায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ এবং একটি সেতুর অংশ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে। তিনি আরও জানান, মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ৫.৮০ মিটার হলেও, গত ১১ জুলাই সকাল ছয়টায় এই নদীতে পানির উচ্চতা ছিল ৬.৫৬ মিটার, যা বিপদসীমার উল্লেখযোগ্যভাবে উপরে।
জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার ২,০৪৮ কিলোমিটার সড়কপথ এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং ২২০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। চকরিয়া, মাতামুহুরী এবং পেকুয়া উপজেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১,৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। নিজেদের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব মানুষ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারছে না।
গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিন কক্সবাজারে ছিল মুষলধারে বৃষ্টিপাত, যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত। এর ফলে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় এবং বেশ কয়েকটি স্থানে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটে। ১২ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, বহু মানুষ এখনো পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথন থেকে জানা গেছে, বন্যার পানি অপসরণের সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসমূহের কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। দুর্গত অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ নিরাপদ পানীয় জল এবং খাদ্যের তীব্র সংকটে ভুগছে। তবে, প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুসারে, বন্যার প্রকোপে জেলার দশটি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টিই কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। পাঁচটি পৌরসভা এলাকার মধ্যে চারটি পৌরসভার বাসিন্দারাও এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই দুর্যোগে জেলার অন্তত সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, বন্যা ও ভূমিধসের সম্মিলিত প্রভাবে জেলায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য।
পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা রাশেদা বেগম তার দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করে বলেন, "গত বুধবার রাতে আমার ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। চার সন্তান নিয়ে এই জলমগ্ন পরিবেশেই বসবাস করতে হচ্ছে। ঘরে রান্নার কোনো সুযোগ নেই; গত পাঁচ দিন ধরে শুধুমাত্র শুকনো খাবার খেয়ে আমরা বেঁচে আছি।"
জেলা ৪৭টি জেলায় এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ৭,৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে আরও ৩,৬৩৫ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২৩৩ মেট্রিক টন চাল বিতরণের কাজ চলমান। তবে, জেলার জন্য আরও ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, নগদ ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, ৪,৮৮৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৯৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের জরুরি চাহিদা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, জুলাই মাসে কক্সবাজারে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেখানে ৯২৪ মিলিমিটার, সেখানে ৪ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে মাত্র নয় দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণেই জেলায় এবার এক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি দ্রুত অপসারিত হয়েছে। তিনি আরও জানান, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।
উন্মোচিত হচ্ছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন
পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া অরুণিমা আশ্রয়ণকেন্দ্রে প্রায় ৪০টি ভূমিহীন পরিবার বসবাস করে। গত মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, আশ্রয়ণকেন্দ্রে পৌঁছানোর রাস্তাটি এখনো জলমগ্ন। কোমরসমান জল ভেঙে মানুষ চলাচল করছে। এমনকি আশ্রয়ণকেন্দ্রের উঠানেও হাঁটুসমান পানি জমে আছে। বন্যায় অন্তত ১৫টি বসতঘরের মেঝে দেবে গেছে এবং সাতটি বসতঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে।
দুপুরের দিকে আশ্রয়ণকেন্দ্রের একটি ঘরে জমে থাকা পানি সরাচ্ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী রাশেদা বেগম। তার ঘরের ভেতরে তখনো হাঁটুপানি বিদ্যমান ছিল। তিনি জানান, "গত বুধবার রাতে আমার বাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এই জলমগ্ন অবস্থায় আমি আমার চার সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছি। রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং গত পাঁচ দিন ধরে আমরা শুধু শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।"
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, "গত সোম ও মঙ্গলবার সারাদিন কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। এর ফলে জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে পানি দ্রুত সাগরের দিকে নেমে যাচ্ছে। তবে, নিচু এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি গ্রামে এখনো প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।"
পেকুয়ার পার্শ্ববর্তী উপজেলা চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা কুতুববাজার থেকে গোবিন্দপুরগামী সড়কটি গত সোমবার দুপুরেও কোমরসমান পানিতে নিমজ্জিত ছিল। যদিও গতকাল দুপুরে সেখানে আর পানি দেখা যায়নি, তবে পানি নেমে যাওয়ার ফলে সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে এই গর্তগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
একইভাবে, চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, হারবাং, কৈয়ারবিল, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, চিরিঙ্গা, বরইতলী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার আওতাধীন শতাধিক সড়কের প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক কিলোমিটার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় স্লুইসগেটের কারণে বন্যার পানি নেমে যেতে বিলম্ব হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, উপজেলার অন্তত ১১টি স্লুইসগেট স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাছ ধরার জাল স্থাপন করে আটকে রেখেছিলেন। মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, "আমরা যখন স্লুইসগেটগুলো খুলে দিয়ে আসি, তখন কিছু কুচক্রী মহল সেগুলো পুনরায় বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে, প্রতিটি স্লুইসগেটে পাহারা বসিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে এবং এখন দ্রুতগতিতে পানি অপসারিত হচ্ছে।"
৮৯০ কোটি টাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বন্যায় জেলায় বসতবাড়ি, মৎস্যসম্পদ, কৃষি, সড়ক অবকাঠামো, সেতু-কালভার্ট, এবং বেড়িবাঁধের ভাঙনসহ মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ৮৯০ কোটি টাকার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে যে, ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন এবং ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল। উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে, পেকুয়া উপজেলায় সর্বাধিক ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া, মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এবং রামুর ৩৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় মোট ১,৬১৩টি বসতবাড়ি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন যে, জেলার ৬১টি ইউনিয়নের অন্তর্গত ২,৪৪০ হেক্টর আয়তনের ৩,৯১৮টি পুকুর এবং ৪৫৩টি চিংড়ি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৭৬৮ জন মৎস্যচাষীর প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, বন্যার পানিতে জেলার ১০,৪০১ একর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, যা অন্তত ৪৩,২১০ জন কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৬,৪৭২ একর আউশ ধান, ৯১৪ একর বীজতলা, ২,৩৫৯ একর শাকসবজি এবং এক শতাধিক একর পানের বরজ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে এবং তাদের কাছে দ্রুত বীজ, সার ও প্রণোদনা সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং পাহাড়ি ঢলের সম্মিলিত প্রভাবে ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ৪৪টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্ব পাড়ায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ এবং একটি সেতুর অংশ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে। তিনি আরও জানান, মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ৫.৮০ মিটার হলেও, গত ১১ জুলাই সকাল ছয়টায় এই নদীতে পানির উচ্চতা ছিল ৬.৫৬ মিটার, যা বিপদসীমার উল্লেখযোগ্যভাবে উপরে।
জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার ২,০৪৮ কিলোমিটার সড়কপথ এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং ২২০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। চকরিয়া, মাতামুহুরী এবং পেকুয়া উপজেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১,৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। নিজেদের বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব মানুষ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারছে না।