Thu 6th Aug 2026, 10:12 pm

‘সংকেত’ ব্যবহার করে টেকনাফে যাত্রীবাহী বাসে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, ১৫-২০ মিনিটে ৫৭ লাখ টাকা লুট

‘সংকেত’ ব্যবহার করে টেকনাফে যাত্রীবাহী বাসে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, ১৫-২০ মিনিটে ৫৭ লাখ টাকা লুট
টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে সংঘটিত ৫৭ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ দু'জনকে আটক করেছে। দিনের বেলায় যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে সংঘটিত এই ডাকাতির ঘটনায় গত সোমবার রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে, ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং বাসের যাত্রীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, টেকনাফ স্টেশন থেকে বাসটি যাত্রা শুরু করার পর বোরকা পরিহিত এক নারী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সেটিকে অনুসরণ করছিলেন। ওই নারীর দেওয়া 'সংকেত' পেয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে সাত-আটজনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল। তারা সড়কের উপর গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠ ফেলে বাসটির গতিপথ রুদ্ধ করে। এরপর, চারজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি বাসে প্রবেশ করে দুই বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এই প্রক্রিয়ায় তাদের ছুরিকাঘাত ও মারধরও করা হয়।

ডাকাতির পর ডাকাতেরা দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। বাস থামিয়ে অর্থ লুটের এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে তাদের সময় লাগে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট। ব্যস্ত সড়কে দিনের বেলায় এমন দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাকে পুলিশ একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে দেখছে। বাসের চালক, সহকারী অথবা কোনো যাত্রীর এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা, তা-ও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ২ আগস্ট বেলা পৌনে একটার দিকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর সন্নিকটে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। টেকনাফ থেকে কক্সবাজারগামী ওই বাসটিতে প্রায় ৩০ জন যাত্রী ছিলেন।

যেভাবে সংঘটিত হলো ৫৭ লাখ টাকা ডাকাতি:

পুলিশ, মামলার এজাহার এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট দুপুরে টেকনাফের দুটি ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করে তিনজন বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধি 'পালকি পরিবহন' নামের একটি বাসে আরোহণ করেন। তাদের কাছে তিনটি পৃথক ব্যাগে টাকা ছিল, যা হ্নীলা বাজারে বিকাশের গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের জন্য নির্ধারিত ছিল।

একরাম হোছেনের কাছে ৩৫ লাখ টাকা, আল আরমানের কাছে ২২ লাখ টাকা এবং আবদুল করিমের কাছে ২৫ লাখ টাকা ছিল। এই তিনজনের কাছে মোট ৮২ লাখ টাকা বিদ্যমান ছিল। বাসে একরাম ও আরমান পাশাপাশি আসনে বসেছিলেন, আর করিম তাদের সামনের আসনে অবস্থান করছিলেন।

বাসটি টেকনাফ বাসস্টেশন অতিক্রম করার পর যাত্রীরা লক্ষ্য করেন যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা তাদের পেছন পেছন আসছে। এই অটোরিকশায় একজন কালো বোরকা পরিহিত নারী ছিলেন। বাসের কয়েকজন যাত্রী জানান, তিনি মুঠোফোনে বারবার কারও সাথে যোগাযোগ করছিলেন।

বেলা একটার দিকে বাসটি দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর সন্নিকটে পৌঁছালে সড়কের উপর গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠের বাটাম ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। চালক বাস থামানোর সাথে সাথেই পাহাড় থেকে সাত-আটজন মুখোশধারী ও অস্ত্রধারী ব্যক্তি দ্রুত নেমে এসে বাসটিকে ঘিরে ফেলে। তারা কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

এরপর চারজন ডাকাত বাসে আরোহণ করে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাসে যাত্রীবেশে অবস্থানরত একজন ব্যক্তি একরাম ও আরমানকে চিহ্নিত করে দেন। এরপর ডাকাত দলের একজন সদস্য আরমানের কাছে থাকা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যাগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে পিঠের ডান পাশে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং পরবর্তীতে তার কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা কেড়ে নেওয়া হয়।

একরামকেও মারধর করে তার কাছে থাকা ৩৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনার পর ডাকাতেরা দ্রুত বাস থেকে নেমে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। একই সময়ে, ওই নারী তার অটোরিকশা নিয়ে কক্সবাজারের দিকে রওনা দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

বাসের যাত্রীরা আরও জানান যে, ডাকাতেরা সরাসরি বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করে। এতে পুলিশের ধারণা, ডাকাত দলের কোনো সদস্য হয়তো আগে থেকেই এই বিক্রয় প্রতিনিধিদের চিনতেন, অথবা বাসে অবস্থানরত অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে তাদের পরিচয় ও টাকার ব্যাগের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছিলেন।

এই ডাকাতির ঘটনায় গত ৩ আগস্ট বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধি একরাম হোছেন বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাত-আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ছুরিকাঘাতে আহত আল আরমান ও একরাম হোছেনকে উদ্ধার করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে আল আরমানকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়।

বিকাশের টেকনাফ এজেন্ট আবদুল করিম জানান, গত ২ আগস্ট প্রতিদিনের ন্যায় তিনজন বিক্রয় প্রতিনিধি হ্নীলা বাজারে গ্রাহকদের অর্থ বিতরণের জন্য যাচ্ছিলেন। তাদের কাছে ব্যাংক থেকে উত্তোলিত মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল, যার মধ্যে দুজনের কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে।

আবদুল করিম আরও বলেন, "বাসটির সামনে দিয়ে একটি অটোরিকশায় একজন নারী অনুসরণ করছিলেন। ওই নারীর সংকেতেই ডাকাতেরা পাহাড় থেকে নেমে এসে লুটপাট চালিয়েছে বলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে, ওই নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।"

চালক ও যাত্রীদের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ:

এই ঘটনার নেপথ্যে আরও কারা জড়িত ছিল, তা নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করছে পুলিশ। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডাকাত দলের সদস্যরা কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল। তাদের বয়স অনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ বছর, গায়ের রঙ শ্যামলা বা কালো। তাদের পরিধানে ছিল হাফ ও ফুল প্যান্ট, গেঞ্জি ও টি-শার্ট।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম পুনরায় নিশ্চিত করে জানান, "ডাকাতির নেপথ্যে বিভিন্ন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বাসটিকে একজন নারীর অনুসরণ করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বাসের চালক, সহকারী কিংবা কোনো যাত্রীর এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা, সেটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

দু'জন গ্রেপ্তার, রিমান্ড আবেদন:

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৫৭ লাখ টাকা লুটের এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গত সোমবার রাতে হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সংলগ্ন নুরালীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আকতার হোসেন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা দু'জনেই লেদা এলাকার বাসিন্দা এবং ঘটনাস্থল থেকে তাদের এলাকার দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বাস থামিয়ে অর্থ লুটের এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত এই দু'জনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আকতার হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা, ডাকাতিসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা বিদ্যমান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এই ডাকাতির ঘটনায় আকতার হোসেন, তার ভাই ইমান হোসেন, ভাগনে কামাল হোসেন, আজিজুর রহমান, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ আলম, রাসেল, খালেকসহ আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত দু'জনকে ডাকাতি মামলায় আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল বুধবার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে, যদিও এখনো আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি এই ডাকাতির সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।