Thu 6th Aug 2026, 3:03 am

বস্তি থেকে দুই বাড়ির মালিকানা: ‘মুসাফির ক্যাফে’র মহিমা মাকওয়ানার সংগ্রাম ও সাফল্য

বস্তি থেকে দুই বাড়ির মালিকানা: ‘মুসাফির ক্যাফে’র মহিমা মাকওয়ানার সংগ্রাম ও সাফল্য
নেটফ্লিক্সের নতুন সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’তে অনবদ্য অভিনয়ের সুবাদে এই মুহূর্তে আলোচনার শীর্ষে তরুণ অভিনেত্রী মহিমা মাকওয়ানা। তার জন্মদিনে, ৫ আগস্ট, এই প্রতিভাবান অভিনেত্রীর সংগ্রামমুখর শৈশব এবং সাফল্যের যাত্রার কিছু অজানা দিক তুলে ধরা হলো, যেখানে অভিনয় তার কাছে কোনো শৈশবের স্বপ্ন ছিল না, বরং ছিল পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই।

জন্মগ্রহণের মাত্র পাঁচ মাস পরেই মহিমা পিতৃহারা হন। বাবার কোনো স্মৃতি তাঁর মনে না থাকলেও, পরিবারের ভরণ-পোষণের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে তার মায়ের কাঁধে। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে যে স্বল্প উপার্জন হতো, তা দিয়ে মুম্বাইয়ের ঘিঞ্জি বস্তির এক ছোট্ট ‘চাওল’-এ মা ও ভাইকে নিয়ে সংসার চালানো ছিল এক দুরূহ কাজ।

মহিমার মা নিজেও একদা অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, যা অপূর্ণ থাকলেও তিনি তার মেয়ের মধ্যে সেই সম্ভাবনা দেখতে পান। নয় বছর বয়স থেকেই শুরু হয় মহিমাকে বিভিন্ন অডিশনে নিয়ে যাওয়ার পালা। কিন্তু ছোট মহিমার কাছে অভিনয় কোনো আনন্দের উৎস ছিল না; বরং স্কুল ছুটির পর বাসে করে এক অডিশন থেকে আরেক অডিশনে নিরন্তর ছুটে বেড়ানো তার জন্য হয়ে ওঠে একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর দৈনন্দিন রুটিন।

তার শৈশব ছিল অত্যন্ত কঠিন। যখন তার সমবয়সীরা খেলাধুলা এবং স্বাভাবিক স্কুলজীবন উপভোগ করত, তখন মহিমার দিন কাটত শুটিং ফ্লোরে। নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তার হয়ে ওঠেনি, অনেক সময় শুধু পরীক্ষার দিনেই সে স্কুলে উপস্থিত হতে পারত।

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে মহিমা প্রকাশ করেন যে, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে উপার্জনের অন্য কোনো বিকল্প পথ ছিল না। ফলস্বরূপ, অভিনয় তার কাছে পেশা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আগেই একটি গুরুদায়িত্বে পরিণত হয়েছিল।

একটি নির্দিষ্ট অপমানজনক ঘটনাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শিশুশিল্পী হিসেবে নানা ছোট চরিত্রে অভিনয় করার সময় একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের সেটে তিনি অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সামনে সংলাপ বলতে গিয়ে চরম নার্ভাস হয়ে পড়েন। দৃশ্যটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে না পারায় পরিচালকের কড়া মন্তব্য তাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করে। তবে সেই অপমান তাকে ভেঙে ফেলার পরিবর্তে, আরও কঠোর অনুশীলন করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

মহিমা পরবর্তীতে বলেন যে, সেই ঘটনাই তাকে এই মৌলিক সত্যটি উপলব্ধি করিয়েছিল যে, এই প্রতিযোগিতামূলক পেশায় টিকে থাকতে হলে মেধার পাশাপাশি নিরলস পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই মহিমা তার প্রথম বাড়ির মালিক হন। কিশোরী বয়সেই টেলিভিশনে তার এক বড় সুযোগ আসে এবং একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের অভূতপূর্ব সাফল্য তার পরিবারের আর্থিক চিত্র সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মুম্বাইয়ের মীরা রোড এলাকায় পরিবারের জন্য একটি বাড়ি কেনেন, এবং একই সময়ে নিজের প্রথম গাড়িটিও কেনেন। ভাড়া বাড়িতে জীবন কাটানো সেই পরিবারের কাছে এটি ছিল এক স্বপ্নপূরণের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

মহিমার ভাষ্যমতে, তার মায়ের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল নিজেদের একটি স্থায়ী আবাস। সেই স্বপ্ন পূরণ করাই তার জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।

ছোট পর্দার পরিচয় ভেঙে বড় পর্দায় নিজের জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ। টেলিভিশনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করার পরেও সিনেমা এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সুযোগ পাওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। অসংখ্য অডিশনে ব্যর্থতা তাকে হতাশ করেছিল; কখনো মাঝপথেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কখনো শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ‘টেলিভিশন অভিনেত্রী’র তকমা, যা বহু নির্মাতার চোখে তাকে শুধু ছোট পর্দার মুখ হিসেবেই আবদ্ধ করে রেখেছিল। এই প্রতিষ্ঠিত ধারণা ভাঙতে তাকে বছরের পর বছর ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

অবশেষে তার জীবনে বড় পর্দায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে সিনেমায় সুযোগ আসতে শুরু করলে তিনি বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র এবং ওটিটি সিরিজে কাজ করে নিজের অভিনয় দক্ষতা ও পরিধি বিস্তৃত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘মুসাফির ক্যাফে’তে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

সম্প্রতি মহিমা মুম্বাইয়ে একটি আরও বড় বাড়ি কিনেছেন, যেখানে তিনি তার মায়ের সাথে বসবাস করেন। নিজের রুচি অনুযায়ী সাজানো এই বাড়িটি তার দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের এক প্রকৃষ্ট প্রতীক।

তবুও একটি অপূর্ণতা আজও মহিমাকে তাড়া করে ফেরে। বাবাকে কখনো দেখার সুযোগ না পাওয়ার মর্মবেদনা তাকে বিচলিত করে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, বন্ধুদের সাথে তাদের বাবার সম্পর্ক দেখলে তার মনে হয়, জীবনের এক অপরিহার্য ও মূল্যবান অনুভূতি তিনি চিরকালই বঞ্চিত থেকেছেন।