Fri 31st Jul 2026, 2:26 am

মোজি অ্যান্ড কোং: ফেসবুক থেকে এ আর রাহমান পর্যন্ত সুরের এক অসাধারণ পথচলা

মোজি অ্যান্ড কোং: ফেসবুক থেকে এ আর রাহমান পর্যন্ত সুরের এক অসাধারণ পথচলা
দীর্ঘদিন ধরে সংগীত জগতে স্বমহিমায় কাজ করছেন শুভেন্দু দাশ শুভ ও সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা। কোক স্টুডিও বাংলার ব্যানারে ‘বুলবুলি’ এবং ‘দাঁড়ালে দুয়ারে’-এর মতো দুটি জনপ্রিয় কাজ উপহার দিয়েছেন এই সংগীত পরিচালক ও শিল্পী জুটি। তবে তখনো তাঁদের কোনো স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম বা ব্যান্ড গঠনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না।

কোনো পূর্বপরিকল্পনা ব্যতিরেকেই, ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নন্দিতার ফেসবুক পেজে তাঁরা প্রকাশ করেন পুরোনো দিনের জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসম’-এর একটি মনোমুগ্ধকর কাভার। গানটি প্রকাশের পর শ্রোতাদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া তাঁদের নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করে, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় একটি নতুন সংগীত উদ্যোগ। ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ‘মোজি অ্যান্ড কোং’ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এই নামের আড়ালে রয়েছে একটি গভীর দর্শন: ‘মোজি’ শব্দটি তাড়াহুড়ো নয়, বরং স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সৃজনশীল কাজ করার এক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।

শুভেন্দু দাশের মতে, ‘পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে এটি আমাদের কাছে এক ধরনের স্বস্তিদায়ক পরিসর, যেখানে নিজেদের ভালো লাগার গান নিয়ে কাজ করার সুযোগ মেলে।’ নন্দিতা যোগ করেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ আনন্দ নিয়ে, নিজেদের পছন্দ ও মেজাজ অনুযায়ী কাজ করি। তাই আমাদের কাছে এটি কখনোই গতানুগতিক বা চাপিয়ে দেওয়া কোনো কাজ বলে মনে হয় না।’

তাঁদের সংগীত চর্চার মূল প্রেরণা নিহিত রয়েছে শৈশবের স্মৃতিতে। মায়ের মুখে শোনা আধুনিক বাংলা গান এবং ক্যাসেটে বেজে ওঠা সোনালি দিনের সুরগুলোই তাঁদের সংগীতের ভিত্তিমূল। তাঁরা সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোকে নতুন সাউন্ড ডিজাইনে সজ্জিত করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আগ্রহী।

এ আর রাহমানের প্রশংসা
তাঁদের সংগীত যাত্রার এক অন্যতম বড় চমক ছিল ‘সাওয়ারিয়া’ গানের কাভার। চলতি বছরের এপ্রিলের এক বৃষ্টিস্নাত দিনে স্টুডিওতে আড্ডার ছলে নন্দিতা যখন গানটি গুনগুন করে গাইছিলেন, শুভেন্দু তাৎক্ষণিকভাবে সেটির একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

গত ১৭ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে শুভেন্দু দেখেন, অসংখ্য মানুষ তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, মূল সুরকার এ আর রাহমান স্বয়ং তাঁর ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তাঁদের ‘সাওয়ারিয়া’ কাভারটি শেয়ার করেছেন। এই অভাবনীয় সংবাদটি শুনে তাঁদের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। নন্দিতা বারবার রাহমানের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল চেক করছিলেন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে তাঁরা নিজেদের সামনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন।

স্বাতন্ত্র্যের পথে মোজি অ্যান্ড কোং
যখন সংগীত জগতে বড় আয়োজনের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে, তখন মোজি অ্যান্ড কোং বেছে নিয়েছে এক ভিন্ন পথ। একটি গিটার এবং দুটি কণ্ঠের এই সীমিত আয়োজনেই তাঁরা গড়ে তুলছেন নিজেদের এক স্বতন্ত্র সংগীতধারা।

শুভেন্দুর অভিমত, কোলাহলপূর্ণ এই সময়ে মানুষ এখন শান্তি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির সুর অন্বেষণ করে। তাঁরা দুজনেই বিশ্বাস করেন যে, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে তাঁদের শান্ত ধারার গান শ্রোতাদের আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। শুভেন্দু স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একদিন একজন অভিভাবক জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের সন্তান পড়াশোনা বা অংক করার সময় আমাদের গান ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে শুনতে ভালোবাসে। এই কথাটি শুনে আমার শৈশবের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।’

নন্দিতা আরও বলেন, ‘একদিন একজন শ্রোতা জানান যে, তাঁর ৮০ বছরের বেশি বয়সী ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মায়ের মুখে একমাত্র আমাদের গান শুনলেই হাসি ফোটে। অন্য এক দিন একজন নারী আমাদের বার্তা দিয়ে জানান, তিনি তীব্র উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি সমস্যায় ভুগছেন। যখন কোনো কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারেন না, তখন তিনি আমাদের গান শোনেন। আমাদের গানগুলো তাঁকে স্থির হতে সাহায্য করে। এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

আসছে মৌলিক গান
কাভার গানের পাশাপাশি শুভ ও নন্দিতা এখন মৌলিক গান নিয়েও নিবিষ্টভাবে কাজ করছেন। চলতি বছরের শেষ দিকে অ্যালবাম অথবা একাধিক সিঙ্গেল আকারে নিজেদের মৌলিক গান প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। যদিও মৌলিক গানে নানা ধরনের বৈচিত্র্য আনার ইচ্ছা রয়েছে, তবু তাঁরা তাঁদের স্বতন্ত্র ‘সফট সাউন্ড’ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।