একসময় প্রায় বিস্মৃত রোগ হাম এ বছর বাংলাদেশে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দৈনিক রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে মোট ৪২,১৭৪ জন হাম বা হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বিপুল সংখ্যক রোগী পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভাস্থ সদর দপ্তরে বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলা সংক্রমণের যে প্রাথমিক তথ্য নিয়মিত জমা পড়ে, সংস্থার জনসংযোগ বিভাগ থেকে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণের চিত্র তুলে ধরতে ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে যে, উল্লিখিত ছয় মাসে বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী রেকর্ড করা হয়েছে। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু দেশেই হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্ব তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ২৬,৬০৭ জন হামের উপসর্গের রোগী নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ১৪,৫২১ জন রোগী নিয়ে তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ দশের মধ্যে অন্যান্য দেশগুলি হলো মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়াতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) এবং সুদান (৫,৭৬৬)।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মন্তব্য করেছেন, 'এবার বাংলাদেশ হাম সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শুধু আক্রান্তের সংখ্যায় নয়, সম্ভবত হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যাতেও বাংলাদেশ এবার বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশকে ছাড়িয়ে যাবে।' উল্লেখ্য, ডব্লিউএইচওর জুন মাসের পূর্ববর্তী নজরদারি প্রতিবেদনে হাম সংক্রমণে ভারত শীর্ষে ছিল; ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটিতে ২৩,৩৬১ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশ ১৪,৭০৪ জন রোগী নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। জুলাই মাসের বর্তমান প্রতিবেদন বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির প্রবণতা নির্দেশ করছে।
চলতি বছরের শুরুতে দেশে হঠাৎ করেই শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ দেখা দেয়, এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ১,১৯,৪৪৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ১৪,৭০৮ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০২ জন এবং নিশ্চিত হাম সংক্রমণে ৯৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ মোট ৭৯৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম বা এর উপসর্গের কারণে।
যদিও বাংলাদেশ এই বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এসেছে, বিগত বছরগুলিতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ২০২৫ সালে ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ডব্লিউএইচওর তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করে ৫ হাজারে পৌঁছায়। এর পরের মাস এপ্রিলে এই সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসে ১৫ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বিশ্বাস করেন যে, ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক হামের তথ্য যে প্রবণতা দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত গণনায়ও তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না। Desi Media Point-কে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শুধু আক্রান্তের দিক থেকে নয়, হামজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সম্ভবত বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এগিয়ে থাকবে।' ডব্লিউএইচওর এই প্রতিবেদন সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে এইবারের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। গত এক বছরে আক্রান্ত প্রায় পাঁচ হাজার এক বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে চার হাজারেরও বেশি শিশু হামের টিকার দুটি ডোজের একটিও গ্রহণ করেনি। একসময় সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। নিয়মিত টিকাদান এবং জাতীয় প্রচারাভিযানের মাধ্যমে হামসহ বিভিন্ন রোগের বড় প্রাদুর্ভাব সফলভাবে এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের ঘাটতিকে দায়ী করছেন।
ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী মোট ৩.৪২ কোটি শিশুকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
৫ মে Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানান যে, ২০২৫ সালে যখন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রচলিত টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল যে, এই পরিবর্তন ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করবে এবং এর ফলস্বরূপ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১.৮১ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, যা সেবারও ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫.২৭ কোটি শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
২০২০-২১ সালের পর থেকে আর কোনো বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি। এর পাশাপাশি, নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও হ্রাস পেতে থাকে, যা ২০২৫ সালে ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকার সংকটও পরিলক্ষিত হয়।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গত এক বছরে হামে আক্রান্ত প্রায় পাঁচ হাজার এক বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে চার হাজারেরও বেশি শিশু হামের টিকার দুটি ডোজের একটিও গ্রহণ করেনি। এক থেকে চার বছর বয়সী চার হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার শিশু টিকার কোনো ডোজ পায়নি, এবং প্রায় ৫০০ জন মাত্র একটি ডোজ পেয়েছে। একইভাবে, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী এক হাজার শিশুর অর্ধেকই টিকার কোনো ডোজ পায়নি।
ডা. মুশতাক হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, 'আমরা টিকাদানের ক্ষেত্রে অবহেলা করেছি, অথচ টিকায় বাংলাদেশের এক গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল।'
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের উপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাদের ৮০ শতাংশই টিকা গ্রহণ করেনি। আরেকটি অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে যে, হামজনিত কারণে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম।
সম্ভাব্য টিকা সংকট ও রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে ইউনিসেফ তখন সতর্ক করে চিঠি দিলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি বলে বর্তমানে সমালোচনা চলছে।
আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান Desi Media Point-কে বলেন, 'হার্ড ইমিউনিটি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর যদি প্রয়োজনীয় টিকাদানের কাভারেজ না থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফলস্বরূপ ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যায়।' বিশেষজ্ঞরা জানান যে, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগ; একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার দুটি ডোজের আওতায় আনার কথা বলে, যাকে 'হার্ড ইমিউনিটি' বলা হয়। এই অবস্থায়, কোনো এলাকায় অল্প সংখ্যক শিশু টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা মূলত এই 'ইমিউনিটি গ্যাপ'-এরই পরিণতি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য একটি বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে। তবে, এই ক্যাম্পেইনেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়েছে। কারণ, হামের টিকাদানের জন্য এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুর হিসাব করা হয়েছিল, অথচ গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। এই অসঙ্গতি প্রকাশিত হওয়ার পর জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী Desi Media Point-কে বলেন, 'এত বিপুল সংখ্যক শিশুর টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ তারা কেবল নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, বরং অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলছে।'
ডা. মুশতাক হোসেন মন্তব্য করেন, 'বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কাজের ক্ষেত্রে ততটা কার্যকর হতে পারেনি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গণটিকাদানের পরেও এত বেশি সংখ্যক মৃত্যু, যা সম্ভবত বাংলাদেশে বেশি।' ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য অংশীদার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার ব্যবস্থা না করলে এই ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে কাটবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভাস্থ সদর দপ্তরে বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলা সংক্রমণের যে প্রাথমিক তথ্য নিয়মিত জমা পড়ে, সংস্থার জনসংযোগ বিভাগ থেকে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণের চিত্র তুলে ধরতে ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে যে, উল্লিখিত ছয় মাসে বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী রেকর্ড করা হয়েছে। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু দেশেই হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে হাম সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্ব তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ২৬,৬০৭ জন হামের উপসর্গের রোগী নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ১৪,৫২১ জন রোগী নিয়ে তৃতীয় স্থানে। শীর্ষ দশের মধ্যে অন্যান্য দেশগুলি হলো মেক্সিকো (১২,৪৯৫), পাকিস্তান (১১,০৩৭), ক্যামেরুন (৯,৬৫৩), কাজাখস্তান (৭,৭৩০), গুয়াতেমালা (৬,৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬,৮১৫) এবং সুদান (৫,৭৬৬)।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মন্তব্য করেছেন, 'এবার বাংলাদেশ হাম সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শুধু আক্রান্তের সংখ্যায় নয়, সম্ভবত হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যাতেও বাংলাদেশ এবার বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশকে ছাড়িয়ে যাবে।' উল্লেখ্য, ডব্লিউএইচওর জুন মাসের পূর্ববর্তী নজরদারি প্রতিবেদনে হাম সংক্রমণে ভারত শীর্ষে ছিল; ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে দেশটিতে ২৩,৩৬১ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশ ১৪,৭০৪ জন রোগী নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। জুলাই মাসের বর্তমান প্রতিবেদন বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির প্রবণতা নির্দেশ করছে।
চলতি বছরের শুরুতে দেশে হঠাৎ করেই শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ দেখা দেয়, এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ১,১৯,৪৪৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ১৪,৭০৮ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০২ জন এবং নিশ্চিত হাম সংক্রমণে ৯৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ মোট ৭৯৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম বা এর উপসর্গের কারণে।
যদিও বাংলাদেশ এই বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এসেছে, বিগত বছরগুলিতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ২০২৫ সালে ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ডব্লিউএইচওর তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করে ৫ হাজারে পৌঁছায়। এর পরের মাস এপ্রিলে এই সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসে ১৫ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বিশ্বাস করেন যে, ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক হামের তথ্য যে প্রবণতা দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত গণনায়ও তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না। Desi Media Point-কে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ যে এবার হামের সংক্রমণের শীর্ষে থাকবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। শুধু আক্রান্তের দিক থেকে নয়, হামজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সম্ভবত বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এগিয়ে থাকবে।' ডব্লিউএইচওর এই প্রতিবেদন সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে এইবারের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। গত এক বছরে আক্রান্ত প্রায় পাঁচ হাজার এক বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে চার হাজারেরও বেশি শিশু হামের টিকার দুটি ডোজের একটিও গ্রহণ করেনি। একসময় সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। নিয়মিত টিকাদান এবং জাতীয় প্রচারাভিযানের মাধ্যমে হামসহ বিভিন্ন রোগের বড় প্রাদুর্ভাব সফলভাবে এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের ঘাটতিকে দায়ী করছেন।
ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী মোট ৩.৪২ কোটি শিশুকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
৫ মে Desi Media Point-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানান যে, ২০২৫ সালে যখন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রচলিত টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল যে, এই পরিবর্তন ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করবে এবং এর ফলস্বরূপ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১.৮১ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, যা সেবারও ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫.২৭ কোটি শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
২০২০-২১ সালের পর থেকে আর কোনো বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি। এর পাশাপাশি, নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও হ্রাস পেতে থাকে, যা ২০২৫ সালে ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকার সংকটও পরিলক্ষিত হয়।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গত এক বছরে হামে আক্রান্ত প্রায় পাঁচ হাজার এক বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে চার হাজারেরও বেশি শিশু হামের টিকার দুটি ডোজের একটিও গ্রহণ করেনি। এক থেকে চার বছর বয়সী চার হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার শিশু টিকার কোনো ডোজ পায়নি, এবং প্রায় ৫০০ জন মাত্র একটি ডোজ পেয়েছে। একইভাবে, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী এক হাজার শিশুর অর্ধেকই টিকার কোনো ডোজ পায়নি।
ডা. মুশতাক হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, 'আমরা টিকাদানের ক্ষেত্রে অবহেলা করেছি, অথচ টিকায় বাংলাদেশের এক গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল।'
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের উপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাদের ৮০ শতাংশই টিকা গ্রহণ করেনি। আরেকটি অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে যে, হামজনিত কারণে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম।
সম্ভাব্য টিকা সংকট ও রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে ইউনিসেফ তখন সতর্ক করে চিঠি দিলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি বলে বর্তমানে সমালোচনা চলছে।
আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান Desi Media Point-কে বলেন, 'হার্ড ইমিউনিটি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর যদি প্রয়োজনীয় টিকাদানের কাভারেজ না থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফলস্বরূপ ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যায়।' বিশেষজ্ঞরা জানান যে, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগ; একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার দুটি ডোজের আওতায় আনার কথা বলে, যাকে 'হার্ড ইমিউনিটি' বলা হয়। এই অবস্থায়, কোনো এলাকায় অল্প সংখ্যক শিশু টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা মূলত এই 'ইমিউনিটি গ্যাপ'-এরই পরিণতি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য একটি বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে। তবে, এই ক্যাম্পেইনেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়েছে। কারণ, হামের টিকাদানের জন্য এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুর হিসাব করা হয়েছিল, অথচ গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। এই অসঙ্গতি প্রকাশিত হওয়ার পর জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী Desi Media Point-কে বলেন, 'এত বিপুল সংখ্যক শিশুর টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ তারা কেবল নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, বরং অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলছে।'
ডা. মুশতাক হোসেন মন্তব্য করেন, 'বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কাজের ক্ষেত্রে ততটা কার্যকর হতে পারেনি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গণটিকাদানের পরেও এত বেশি সংখ্যক মৃত্যু, যা সম্ভবত বাংলাদেশে বেশি।' ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য অংশীদার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার ব্যবস্থা না করলে এই ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে কাটবে না।