Wed 22nd Jul 2026, 2:10 am

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: টিকে থাকার পরও যে নিবিড় মানসিক সংগ্রাম চলমান থাকে

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: টিকে থাকার পরও যে নিবিড় মানসিক সংগ্রাম চলমান থাকে
বাংলাদেশে দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি প্রতিক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পাচ্ছে না। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরের নিবিড় অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে: দুর্যোগের শিকার মানুষের প্রতি সহায়তা স্বল্পকালীন কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে পরিচালিত হওয়া অপরিহার্য। কারণ, শারীরিক বেঁচে থাকা মানেই মানসিক স্বাভাবিকতা ফিরে আসা নয়। যদিও প্রাথমিক সংকটকালীন সময়ে নানা ধরনের সহায়তার উদ্যোগ চোখে পড়ে, কিন্তু কয়েক মাস পেরোতেই সেই সমর্থন প্রায়শই স্তিমিত হয়ে আসে। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, এ ধরনের বিপর্যয়ের অভিঘাত মাসের পর মাস এমনকি বছর জুড়ে মানুষের জীবনে গভীর রেখা টেনে যায়।

২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত এক বিধ্বংসী বিমান দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পরেও অসংখ্য আহত শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের জীবনে সেই বিভীষিকাময় দিনের গভীর প্রভাব বিদ্যমান। তবে এই এক বছরের যাত্রাপথ কেবল বেদনার গল্প নয়; এটি ধীরে ধীরে জীবনকে পুনর্গঠিত করার এক অবিচল প্রয়াসের উপাখ্যানও বটে। এই সময়ের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে লক্ষণীয় ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেকে পুনরায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে ফেরা শুরু করেছে, কেউ কেউ তাদের দৈনন্দিন রুটিন পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম হয়েছে, আবার কারও কারও মধ্যে রাগ ও বিরক্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিছু শিক্ষার্থী এখন তাদের ব্যায়াম, ম্যাসাজ বা চিকিৎসা-সম্পর্কিত কিছু দায়িত্ব নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সঠিক সময়ে এবং নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন পেলে ভুক্তভোগীরা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে সক্ষম।

তবে, এই পুনর্গঠনের পথ সবার জন্য মসৃণ নয়। এক বছর পরেও কিছু শিক্ষার্থী তীব্র মানসিক চাপের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করছে। নিদ্রাহীনতা অনেকেরই নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ এখনো মাঝেমধ্যে বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন দেখে। আগুন বা পোড়া গন্ধ তাদের মধ্যে গভীর ভীতি সঞ্চার করে। আবার অনেকে এখনো হারানো বন্ধুদের স্মৃতিতে মগ্ন হয়ে রাতে ঘুমাতে অনিচ্ছুক। তাদের পড়াশোনার ওপরও এর সুস্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে একটি বড় দুর্ঘটনার অভিঘাত কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একজন ব্যক্তির শিক্ষা, মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং সামগ্রিক ভবিষ্যৎকে দীর্ঘকালব্যাপী প্রভাবিত করতে পারে।

আকাশ (ছদ্মনাম) এখনো চোখ বুজলেই সেই বন্ধুদের মুখ দেখে, যারা এক বছর আগে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে তার চোখের সামনেই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, সে যতটা সম্ভব ঘুমকে পরিহার করার চেষ্টা করে। ঘুম তার কাছে এখন আর বিশ্রামের উৎস নয়, বরং ভীতির আরেক দ্বার। তার রাত কাটে মুঠোফোনের আলোয়, আর ভোর হয় ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটি নতুন দিনের সূচনায়। দুর্ঘটনার পর আকাশের জীবন অনেকটাই পাল্টে গেছে। সে নতুন একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। শরীরের আঘাতের দাগ নিয়ে কেউ মন্তব্য করলে সে অস্বস্তি ও বিরক্তি অনুভব করে। পরিবার লক্ষ্য করেছে যে তার খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে; মানসিক চাপের সময় সে অতিরিক্ত আহার করে এবং দিনের একটি বড় অংশ মুঠোফোনের পর্দায় ব্যয় করে। বাহ্যিকভাবে তাকে হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার প্রতিটি রাত যেন মনে করিয়ে দেয় যে একটি দুর্ঘটনার প্রভাব কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক স্তরে কত দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।

সাবিনা (ছদ্মনাম)-এর জীবনের প্রতিটি দিন এখন হাসপাতাল, ঔষধপত্র, ড্রেসিং, প্রেসার গার্মেন্টস এবং ফলো-আপের নির্দিষ্ট সময়সূচি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত তার একমাত্র গভীর চিন্তা—তার মেয়েটি আজ কেমন আছে? প্রতিদিন তাকে প্রেসার গার্মেন্টস পরতে, ম্যাসাজ করতে এবং ব্যায়াম করতে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। কখনো মেয়ে বিরক্ত হয়ে রাগ করে, কখনো বা বলে, ‘আজ আর ভালো লাগছে না।’ সে সময় সাবিনা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন—জোর করবেন নাকি হাল ছেড়ে দেবেন। সন্তানের শরীরের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালেও তার মনের ভয় ও অস্থিরতা এখনো সম্পূর্ণরূপে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এই এক বছরে সাবিনা নিজের কথা ভাবার সুযোগ পাননি বললেই চলে। সংসার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, চিকিৎসা—সবকিছুর বোঝা একযোগে সামলাতে গিয়ে তিনি প্রায়শই মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তবুও প্রতিদিন তিনি নিজেকে সুদৃঢ় রাখেন, কারণ তিনি জানেন যে সন্তান যদি তাকে ভেঙে পড়তে দেখে, তবে সেও হয়তো আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাবে না।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পর আকাশ ও সাবিনার মর্মস্পর্শী কাহিনী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বড় দুর্ঘটনার প্রভাব কেবল ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জীবনেই নয়, বরং তাদের পাশে থাকা অভিভাবকদের জীবনেও এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সুতরাং, দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সহায়তা কেবলমাত্র শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, তাদের পরিবারের জন্যও সমানভাবে অত্যাবশ্যক। মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা এবং তাদের পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা দুটি ভিন্ন বিষয়। শারীরিক চিকিৎসার দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া অনেকের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনো দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, একাধিক অস্ত্রোপচার, প্রেসার গার্মেন্টস ব্যবহার অথবা নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া তাদের জন্য শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত ক্লান্তিকর। কেউ কেউ শরীরের স্থায়ী দাগ নিয়ে অস্বস্তি বোধ করছে, অন্যের সামনে যেতে চাইছে না বা নিজেদের নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছে। এই পুরো সময়কালে অভিভাবকেরাও কম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হননি। সন্তানকে পূর্বের জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় তারাও ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং অনেক ক্ষেত্রে অসহায়ত্ব অনুভব করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

গত এক বছরে, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাকের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের যৌথ সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও, অভিভাবকদের চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় নিয়ে দুটি প্যারেন্টস গ্রুপ সেশনের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিভাবকদের অনুভূতি শোনা, বোঝা এবং তাদের সন্তানদের ওপর দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমাদের সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, এমন একটি দুর্ঘটনার প্রভাব কেবল একজন শিক্ষার্থীর উপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো পরিবারই এর ভার বহন করে, তাই যত্ন প্রদানকারীদের (কেয়ারগিভার) সুস্থতা ও যত্নও অপরিসীম।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি কেবল স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্ত নয়; এটি আমাদের জন্য গভীর শিক্ষণেরও সময়। প্রথমত, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তাকে আবশ্যিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী ফলো-আপের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ছাড়াও তাদের অভিভাবক/পরিবারের যত্ন প্রদানকারী ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার এই দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জিং যাত্রায় তারাও সমানভাবে প্রভাবিত হন। তৃতীয়ত, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি পূর্ব-সমন্বিত ও শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের মুহূর্তে নতুন উদ্যোগের চেয়ে সুসংগঠিত প্রস্তুতি ও অংশীদারত্ব অনেক বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে, আমাদের সামাজিক আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। দুর্ঘটনার পর অতিরিক্ত কৌতূহল প্রদর্শন, বারবার ঘটনার বিবরণ জানতে চাওয়া, শারীরিক ক্ষত নিয়ে মন্তব্য করা, বা ছবি/ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া—এই ধরনের আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ট্রমা-সংবেদনশীল আচরণ এখন শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদেরই দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, বিদ্যালয়, কমিউনিটি এবং গণমাধ্যম সহ সমাজের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। এই এক বছরপূর্তিতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত মানসিক স্বাস্থ্যকে আর একটি ঐচ্ছিক বা ‘পরের ধাপ’ হিসেবে না দেখে, বরং দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি সহায়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, শরীরের ক্ষত একসময় শুকিয়ে গেলেও, মনের ক্ষত নিরাময়ে সময়ের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন, গভীর সহমর্মিতা এবং সম্মিলিত সামাজিক দায়বদ্ধতা।
ডা. শায়লা ইসলাম, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি।