জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই তিন প্রকল্পের সম্মিলিত বাস্তবায়নে প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাপানের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) এবং লাইন-৫ নর্দার্ন (হেমায়েতপুর-ভাটারা) এর সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব। এছাড়াও, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্পটিও অনুমোদন পেয়েছে। এই তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প সহ, গত বুধবার একনেক মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় নতুন সাতটি এবং সংশোধিত পাঁচটি প্রকল্পকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সাংবাদিকদের কাছে মেট্রোরেল প্রকল্পগুলির সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
সূত্র মতে, গত বুধবার একনেক সভার মূল কার্যসূচীতে কেবলমাত্র এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা থাকলেও, পরবর্তীতে জাপানের অর্থায়নে পরিচালিত দুটি সংশোধিত মেট্রোরেল প্রকল্পকেও অনুমোদনের জন্য একইসাথে একনেকে পেশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে আনুমানিক ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে। একইভাবে, জাপানের অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের জন্য ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অপরদিকে, ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের (যার মধ্যে ১৩.১০ কিলোমিটার পাতাল অংশ) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল, এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত), এর সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ১১৭.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি হলো হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এমআরটি করিডোর নির্মাণ ও চালু করা।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ রুট) শীঘ্রই আলোর মুখ দেখতে প্রস্তুত। এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত এই মেট্রোলাইনটি হবে ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে হাতিরঝিল অংশটি টানেলের মাধ্যমে যাবে, এবং আফতাবনগর থেকে অবশিষ্ট অংশটি উড়ালপথে নির্মিত হবে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে এবং অবশিষ্ট ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা যৌথভাবে সরবরাহ করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (ইডিসিএফ)।
সরকার দেশে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে এই ট্রেন চলাচল করবে। ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯৪২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে, এবং অবশিষ্ট অর্থ উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রদান করবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে।
এই প্রকল্পের অধীনে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের ৫২.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এর জন্য মোট ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ করা হবে। এছাড়াও, বৈদ্যুতিক ট্রেনগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুরে একটি আধুনিক ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) প্রকল্প ঋণ থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিদ্যুৎ-নির্ভর ট্রেন পরিচালনার এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশাবাদী যে, এর ফলে ব্যস্ত নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডোরে রেল পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং ডিজেল-নির্ভরতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসারণ কমানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি: কাজের পরিধি সম্প্রসারণ ও অন্যান্য কারণ : পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি
মেট্রোরেলের দুটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সাংবাদিকদের জানান যে, প্রকল্পের কাজের পরিধি ও আওতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বিশদ ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বিভিন্ন স্থানে স্টেশনের অবস্থান পরিবর্তন সহ প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের বিস্তার ঘটেছে, যার ফলস্বরূপ নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রকল্পের ঋণ জাপানি মুদ্রা ইয়েনে হলেও, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্যমানের ওঠানামা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এছাড়াও, মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং প্রকল্প ব্যয়ের সাথে সম্পর্কিত ভ্যাট ও ট্যাক্সের পরিমাণ বৃদ্ধিও মোট ব্যয় বাড়িয়েছে। তবে, সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে ঋণের সুদের হার। প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরুতে জাইকার ঋণের সুদের হার ০.৭ শতাংশ ধরা হলেও, দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমানে তা বেড়ে ৩.০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আগামীতে প্রকল্পের কাজ আরও বিলম্বিত হলে সুদের হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে একনেকে উপস্থাপন করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও, প্রতিমন্ত্রী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তার মতে, ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং তীব্র যানজটের পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে মেট্রোরেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব হ্রাসের পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা বেঁচে যাবে।
একনেক সভায় ১২টি প্রকল্প অনুমোদন, যার মোট ব্যয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা:
অনুমোদিত প্রকল্পগুলির মধ্যে সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রকল্পগুলির মোট ব্যয়ের মধ্যে ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ থেকে সংস্থান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সভায় অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ পাঁচটি প্রকল্প পেয়েছে। এগুলি হলো—ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেলের লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট), রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহের মানোন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প, এবং মেট্রোরেলের লাইন-৫ (নর্দান রুট) ও লাইন-১ এর প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধন) প্রকল্প।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন (দ্বিতীয় পর্যায়) এবং খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন (১ম সংশোধন) প্রকল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের জন্য উন্নত কাজের পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রকল্প, এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন ও সম্প্রসারণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক পূর্বে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।
সূত্র মতে, গত বুধবার একনেক সভার মূল কার্যসূচীতে কেবলমাত্র এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা থাকলেও, পরবর্তীতে জাপানের অর্থায়নে পরিচালিত দুটি সংশোধিত মেট্রোরেল প্রকল্পকেও অনুমোদনের জন্য একইসাথে একনেকে পেশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে আনুমানিক ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে। একইভাবে, জাপানের অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের জন্য ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অপরদিকে, ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের (যার মধ্যে ১৩.১০ কিলোমিটার পাতাল অংশ) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল, এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত), এর সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ১১৭.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি হলো হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এমআরটি করিডোর নির্মাণ ও চালু করা।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ রুট) শীঘ্রই আলোর মুখ দেখতে প্রস্তুত। এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত এই মেট্রোলাইনটি হবে ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে হাতিরঝিল অংশটি টানেলের মাধ্যমে যাবে, এবং আফতাবনগর থেকে অবশিষ্ট অংশটি উড়ালপথে নির্মিত হবে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে এবং অবশিষ্ট ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা যৌথভাবে সরবরাহ করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (ইডিসিএফ)।
সরকার দেশে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে এই ট্রেন চলাচল করবে। ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯৪২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে, এবং অবশিষ্ট অর্থ উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রদান করবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে।
এই প্রকল্পের অধীনে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের ৫২.৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এর জন্য মোট ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ করা হবে। এছাড়াও, বৈদ্যুতিক ট্রেনগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুরে একটি আধুনিক ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) প্রকল্প ঋণ থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিদ্যুৎ-নির্ভর ট্রেন পরিচালনার এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশাবাদী যে, এর ফলে ব্যস্ত নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডোরে রেল পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং ডিজেল-নির্ভরতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসারণ কমানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি: কাজের পরিধি সম্প্রসারণ ও অন্যান্য কারণ : পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি
মেট্রোরেলের দুটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সাংবাদিকদের জানান যে, প্রকল্পের কাজের পরিধি ও আওতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বিশদ ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বিভিন্ন স্থানে স্টেশনের অবস্থান পরিবর্তন সহ প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের বিস্তার ঘটেছে, যার ফলস্বরূপ নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রকল্পের ঋণ জাপানি মুদ্রা ইয়েনে হলেও, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্যমানের ওঠানামা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এছাড়াও, মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং প্রকল্প ব্যয়ের সাথে সম্পর্কিত ভ্যাট ও ট্যাক্সের পরিমাণ বৃদ্ধিও মোট ব্যয় বাড়িয়েছে। তবে, সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে ঋণের সুদের হার। প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরুতে জাইকার ঋণের সুদের হার ০.৭ শতাংশ ধরা হলেও, দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমানে তা বেড়ে ৩.০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আগামীতে প্রকল্পের কাজ আরও বিলম্বিত হলে সুদের হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে একনেকে উপস্থাপন করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও, প্রতিমন্ত্রী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তার মতে, ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং তীব্র যানজটের পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে মেট্রোরেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব হ্রাসের পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা বেঁচে যাবে।
একনেক সভায় ১২টি প্রকল্প অনুমোদন, যার মোট ব্যয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা:
অনুমোদিত প্রকল্পগুলির মধ্যে সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রকল্পগুলির মোট ব্যয়ের মধ্যে ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ থেকে সংস্থান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সভায় অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ পাঁচটি প্রকল্প পেয়েছে। এগুলি হলো—ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেলের লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট), রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহের মানোন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্প, এবং মেট্রোরেলের লাইন-৫ (নর্দান রুট) ও লাইন-১ এর প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধন) প্রকল্প।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন (দ্বিতীয় পর্যায়) এবং খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন (১ম সংশোধন) প্রকল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের জন্য উন্নত কাজের পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রকল্প, এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন ও সম্প্রসারণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক পূর্বে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।
