Thu 23rd Jul 2026, 2:09 am

বর্ষার খইয়াছড়া: প্রকৃতির মোহনীয় হাতছানি, তবু ঝুঁকিমুক্ত ভ্রমণে চাই বাড়তি সতর্কতা

বর্ষার খইয়াছড়া: প্রকৃতির মোহনীয় হাতছানি, তবু ঝুঁকিমুক্ত ভ্রমণে চাই বাড়তি সতর্কতা
দূর থেকে ভেসে আসে ঝরনার অবিরাম জলধারার মন মুগ্ধ করা কলতান। নিবিড় অরণ্যের পথ অতিক্রম করে এই ধ্বনির উৎসমুখে উপনীত হলে এক অপ্রত্যাশিত মুগ্ধতা গ্রাস করে মনকে। বর্ষার সজীবতায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরনা যেন তার সমস্ত প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য উজাড় করে দেয়। তবে, এই অনিন্দ্য সৌন্দর্যের আড়ালে পদে পদে লুকিয়ে থাকে বিপদের হাতছানি। সামান্য অসতর্কতাও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ প্রদত্ত তথ্যানুসারে, বিগত ছয় বছরে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন ঝরনা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৭টি দুর্ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এই সকল দুর্ঘটনায় সাতজন পর্যটকের প্রাণহানি ঘটে এবং ৫১ জন আহত হন। মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোর মধ্যে খইয়াছড়াই দুর্ঘটনার প্রবণতায় শীর্ষে। তা সত্ত্বেও, প্রতি বছর, বিশেষত বর্ষাকালে, অগণিত পর্যটক এই ঝরনার বন্য আকর্ষণ অনুভব করতে ছুটে আসেন। তারা দুর্গম ট্রেইল ও পাহাড় ডিঙিয়ে প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়ের সান্নিধ্যে পৌঁছান। ঝরনায় আগত দর্শনার্থীদের অধিকাংশই তরুণ, যারা প্রায়শই ঝুঁকি গ্রহণে দ্বিধা করেন না।

খইয়াছড়া ঝরনার দুর্গম অবস্থান এবং এর পথে নিবিড় অরণ্য ও পাহাড়ের সারি পর্যটকদের কৌতূহল বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। মিরসরাই উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খইয়াছড়া গ্রামে এর অবস্থান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ি বনভূমি অতিক্রম করে এই ঝরনায় পৌঁছাতে হয়। মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার পাকা পথ পার হলেই গ্রামীণ মেঠো পথের সূচনা। এরপরই দেখা যায় ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া, যার স্বচ্ছ পাথুরে জলে পা ডোবালে শরীর জুড়িয়ে যায়। এই পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার সময় ছড়ার দু'পাশের পাহাড়ি বন থেকে ভেসে আসা পাখির কলতান যেন প্রকৃতির নিজস্ব সুর হয়ে কানে বাজে। ছড়ার দিকে ঝুঁকে থাকা গাছে পরিপক্ক বুনো ডুমুরের থোকা বন্য পথের যাত্রীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। ছড়া অতিক্রম করার পর শুরু হয় পাহাড় ডিঙানোর পালা। কয়েকটি ধাপে ছোট-বড় পাহাড় পেরিয়েই চোখে পড়ে খইয়াছড়া ঝরনার নয়নাভিরাম রূপ। প্রথম দর্শনেই পাহাড় পরিবেষ্টিত এই ঝরনার সৌন্দর্য যে কাউকে বাকরুদ্ধ করে দিতে পারে। সুউচ্চ পাহাড়চূড়া থেকে সশব্দে নেমে আসা জলধারা চারপাশে এক মোহনীয় আবহের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বৃহত্তম পাহাড়ি ঝরনাগুলোর মধ্যে খইয়াছড়া অন্যতম। এটি ছাড়াও মিরসরাইয়ে নাপিত্তাছড়া, সোনাইছড়ি, বাওয়াছড়া, রূপসী সহ বেশ কয়েকটি পরিচিত ঝরনা রয়েছে। এই ঝরনাগুলো চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের আওতাধীন এবং বন বিভাগ ইজারাদারের মাধ্যমে এগুলোর তত্ত্বাবধান করে।

গত সোমবার দুপুরে খইয়াছড়া ঝরনা পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও পর্যটকদের আনাগোনা নেহাতই কম নয়। অনেককেই ঝরনার পাদদেশের প্রাকৃতিক কূপে দলবদ্ধভাবে আনন্দ-উচ্ছ্বাস করতে দেখা যায়, কেউ কেউ ছবি তুলে স্মরণীয় মুহূর্তগুলি ক্যামেরাবন্দী করছিলেন। সেখানেই ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজমল হাকিমের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি Desi Media Pointকে জানান, ‘আমরা তিন বন্ধু মিলে এই প্রথম খইয়াছড়া ঝরনায় ঘুরতে এসেছি। এই ঝরনার সৌন্দর্য সত্যিই অপরূপ। এখানে শুধু ঝরনা নয়, বন-পাহাড়ের অপূর্ব মিতালি, শীতল ঝিরিপথ এবং পাহাড়ি পথে ট্রেকিংয়ের অনাবিল আনন্দও উপভোগ করেছি।’

খইয়াছড়া ঝরনা পরিদর্শনে আগত পর্যটকদের সুনির্দিষ্ট কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। বিশেষত, প্রবল বর্ষণের সময়ে পাহাড়ি ছড়ায় আকস্মিক ঢল নামতে পারে, তাই এমন পরিস্থিতিতে ঝরনা ভ্রমণ পরিহার করা উচিত। বন বিভাগ ও ইজারাদার কর্তৃক নির্দেশিত পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথে ভ্রমণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নির্দেশ অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে ঝরনার চূড়ায় আরোহণ করা সম্পূর্ণ বর্জনীয়। একইভাবে, ঝরনার বিপজ্জনক স্থানে দাঁড়িয়ে ছবি বা সেলফি তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে একজন স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা গ্রহণ করাকে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যান এলাকার, যার মধ্যে খইয়াছড়া ঝরনাও অন্তর্ভুক্ত, ঝরনাগুলোর ইজারাদার হলো 'থ্রি-বি' নামক একটি পর্যটন সংস্থা। এই সংস্থার স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদুল ইসলাম Desi Media Point-কে জানান, ‘আয়তনে খইয়াছড়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঝরনা, এবং প্রতি বছর এখানে পর্যটকদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, কতিপয় পর্যটকের অসাবধানতা ও অতিরিক্ত কৌতূহলের কারণে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করেছি এবং বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছি।’ বারইয়াঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, ‘মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড অঞ্চলে বিদ্যমান পাহাড়ি ঝরনাগুলোর মধ্যে খইয়াছড়া বৃহত্তম। বর্ষাকালে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। তবে, অতি উৎসাহী কিছু পর্যটক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। ছড়া এলাকার গভীর কূপগুলো সাবধানে পার হওয়া, ভারী বৃষ্টির সময় ঝরনা এলাকায় ভ্রমণ না করা, এবং ঝরনার চূড়ায় উঠে সেলফি না তোলা সহ বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।’

খইয়াছড়া ঝরনা পরিদর্শনের জন্য দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে, বিশেষত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করে, বড়তাকিয়া বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ঝরনার অভিমুখে যাত্রা করা সম্ভব। পথে ঝরনা সংলগ্ন এলাকায় খাবারের সুব্যবস্থা আছে। এছাড়াও, বড়তাকিয়া বাজারের বিভিন্ন রেস্তোরাঁতেও খাদ্যের আয়োজন রয়েছে। রাত্রিযাপনের প্রয়োজন হলে বড়তাকিয়া বাজার, মহামায়া হ্রদ এবং বারইয়ারহাট পৌর বাজারের বেশ কয়েকটি হোটেলে থাকা যেতে পারে। এছাড়াও, সোনা পাহাড়ে একটি ফার্ম হাউস রিসোর্ট বিদ্যমান, যেখানে থাকার জন্য পূর্বেই বুকিং নিশ্চিত করতে হবে।